রোববার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ , ১১:১৮ পিএম
জমি কেনাবেচার কথা শুনলেই যে কারও মধ্যে ভোগান্তি ও দুশ্চিন্তা শুরু হয়। জমি রেজিস্ট্রি কাজে সেবাপ্রার্থীদের সেই ভোগান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করতে বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়। জমি রেজিস্ট্রি কাজে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অনিয়ম ও ভোগান্তি দূর করে স্বচ্ছতা এসেছে ঢাকা তেজগাঁওয়ে রেজিস্ট্রিশন কমপ্লেক্সে। ফলে করোনা মহামারির সময়েও সরকারের রাজস্বখাত চাঙ্গা রেখেছে নিবন্ধন অধিদপ্তর।
জানা গেছে, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসসহ মোট ১০টি অফিস নিয়ে গঠিত তেজগাঁওয়ে রেজিস্ট্রিশন কমপ্লেক্স। সেখানে করোনা মহামারির মধ্যেও স্বাস্থবিধি মেনে জমি কেনাবেচা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এতে এক দিকে মানুষ জরুরি প্রয়োজনে জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছেন, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব খাতের আয়ও অব্যাহত রয়েছে। তবে সারাদেশে জমি রেজিস্ট্রি অফিসগুলোর তুলনায় সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় করে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়। রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সেবা নিতে আসা মানুষদের স্বাস্থবিধি মানতে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগে ভবনের মূল ফটকের সামনের গাড়ি পার্কিং ও হকারদের আনাগোনা থাকলেও এখন সেটি নেই। সেবাপ্রার্থীরা এখন স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের সেবা নিতে পারছেন। তেজগাঁওয়ে রেজিস্ট্রিশন কমপ্লেক্সে আগের তুলনায় দালালদের দৌরাত্ম্য কমেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনা মহামারির মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে মন্দাভাব দেখা গেলেও আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ নিবন্ধন অধিদপ্তরে চাঙ্গাভাব। এই বিভাগে জমিজমা রেজিস্ট্রেশন কাজ করোনার আগেও যেমন রাজস্ব আদায় হয়েছে, করোনাকালীন সময়েও রাজস্ব আদায় অব্যাহত রয়েছে। এতে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় জনবান্ধব করা ও অনিয়ম রুখে দেওয়াসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কারণে করোনার মধ্যে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয়েছে।

এ ছাড়াও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবিকুন নাহার রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের চিরচেনা দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটাতে কাজ শুরু করেন। কমপ্লেক্স আঙিনা হয়ে উঠেছিল গাড়ি পার্কিংয়ের স্থল। বহিরাগতরা এখানে গাড়ি পার্কিং করত অবাধে। এতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে, সেবাগ্রহীতাদের চলাচলই কঠিন হয়ে পড়ে। সেই অবস্থা এখন নেই। আঙিনা উন্মুক্ত। দেয়ালের পাশে করা হয়েছে বাগান। বাইরের এই পরিবর্তনের পাশাপাশি তিনি অফিসের চেহারা পাল্টাতেও ভূমিকা রাখেন।
আশুলিয়ার সাব-রেজিস্ট্রার রেজাউল করিম বলেন, বর্তমান ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে। একজন সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে সেবাপ্রার্থীদের দলিল সম্পন্ন করতে যেকোনো সমস্যায় পড়লে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে সহজেই পরামর্শ নিতে পারি। জমি কেনাবেচা করতে আসা মানুষ যাতে ভোগান্তিতে না পড়েন সে জন্য নির্দেশনা দেন, উৎসাহিত করেন।
শ্যামপুর সাব-রেজিস্ট্রার আরিফুর রহমান বলেন, জমি রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে আইন, বিধি থেকে শুরু করে জনবান্ধব কর্মকাণ্ড বর্তমান জেলা রেজিস্ট্রার অভিজ্ঞ ও আন্তরিক। আইনি জটিলতার কারণে দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে জেলা রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সহজেই তা নিয়ে পরামর্শ করা যায়।
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু কর্মচারীকে বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে নকল নবিশ থেকে টিসি মোহরার পদে তিন জনের পদোন্নতি দিয়ে কর্মস্থল বদলি করা হয়েছে। টিসি মোহরার থেকে পদোন্নতি দিয়ে তিনজনকে অফিস সহকারি করা হয়েছে। তাদের কর্মস্থল বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছয়জন মোহরারকে বদলি করা হয়েছে।
মোহরার থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতি পাওয়া জয়নাল আবেদীন বলেন, তেজগাঁওয়ে রেজিস্ট্রিশন কমপ্লেক্সে অনিয়ম ও সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমেছে। আগে কর্মচারীদের পদোন্নতি পেতে ঊর্ধ্বতনদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। পদোন্নতি পেতে ঘুষ বাণিজ্য হয়েছে কিন্তু এবার নিয়ম মাফিক পদোন্নতি হয়েছে। পদোন্নতি পেতে কোনো ধরনের অর্থের প্রয়োজন হয়নি।
নকল নবিশ থেকে টিসি মোহরার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া মুহসীন চৌধুরী বলেন, আমার পদোন্নতি পেতে কোনো অর্থের প্রয়োজন হয়নি। অর্থ প্রয়োজন হলে আমি কখনই অর্থ দিতে পারতাম না। তিনি পদোন্নতি পাওয়ায় বর্তমান জেলা রেজিস্ট্রারকে ধন্যবাদ জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সেবাপ্রার্থীদের যেমন হয়রানি কমেছে। তেমনি একই অফিসে দীর্ঘদিন কাজ করা ও ঘাপটি মেরে বসে থাকা কর্মচারীদের বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার নিজেই নিয়মিত সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করছেন। সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সঠিক সময়ে অফিসে আসার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এতে সেবা নিতে আসা প্রার্থীদের ভোগান্তি কমছে। কোনো সেবাপ্রার্থী দলিল করতে এসে সমস্যায় পড়লে সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিতে পারেন। তার দপ্তর সকল সেবাপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা, জটিলতা নিরসনের জন্য যে কেউ সেখানে যেতে পারেন। ফোনেও পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। দলিল রেজিস্ট্রি খাতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলাকে একটি নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করছেন জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার।
কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রার জানান, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার তেজগাঁওয়ে রেজিস্ট্রিশন কমপ্লেক্সে আগে দুর্নীতি, ঘুষ ও অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান জেলা রেজিস্ট্রার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ হয়েছে। তার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে সততা এবং কর্মদক্ষতা। সেবাপ্রার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি নিরসেন তার নজিরবিহীন কর্মকাণ্ড পুরো জেলা রেজিস্ট্রি অফিস গর্বিত। সততার কারণে ঢাকার জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো স্বচ্ছতা ও কাজের গতি এসেছে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও ঘুষের পথ বন্ধ হয়েছে। দলিল আটকিয়ে কেউ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে জেলা রেজিস্ট্রার তা তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।
সরেজিমন তদন্ত করে দেখা যায়, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে সাবিকুন নাহার ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর যোগদান করেন। যোগদান করেই জেলা রেজিস্ট্রেশন অফিসে স্বচ্ছতা নিয়ে আসা এবং সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ করতে ১০০ দিনের একটি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নেন। ক্র্যাশ প্রোগ্রামের প্রথম বিষয় ছিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত নিয়মিত অফিস করা। ফলে দীর্ঘদিন চলে আসা ঢিলেঢালা অফিস করা বন্ধ হয়েছে। তিনি নিজেও সকল সাড়ে ৮টায় অফিসে আসেন।
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পরেই সাব-রেজিস্ট্রার, কর্মচারী, দলিল লেখক, মোহরার, নকল নবিশদের নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনায় বসেন। সকলের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে সমস্যা সমাধান করে কাজের মান বৃদ্ধি করেছেন।
ক্র্যাশ প্রোগ্রামের দ্বিতীয় বিষয় দুর্নীতিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা। সাব-রেজিস্ট্রার ও কর্মচারীদের ঘোষণা দেন ‘তিনি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করবেন না। তবে অন্য কেউ অনিয়ম-দুর্নীতি করলে নিজ দায়িত্বে করবেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে দূরে সরে আসেন। এরপরও যারা অসৎ কাজে ও দায়িত্ব অবহেলার করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন সাবিকুন নাহার। কারও কারও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শকের কাছে লিখিত আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে সাবিকুন নাহার যোগদানের আগে একটা নিয়ম প্রায় প্রচলিত ছিল প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে খরচ বাবদ মাসোয়ারা দেওয়া হতো জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসে। তিনি যোগদানের পর এই অন্যায় বন্ধ করে দেন। এমনকি অফিস অডিটের নামে খরচ গ্রহণের দীর্ঘদিনের রেওয়াজটি বন্ধ করে দিয়ে সাবিকুন নাহার ঘোষণা দেন ‘আমাকে কিছু দিলে, আপনাদেরকে কিছু নিতে হবে। তাই দুপক্ষের দেয়া-নেয়া বন্ধ করে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা দিতে হবে। তা হলেই নিবন্ধন অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের ইমেজ সংকট কেটে যাবে।
আইনগত জটিলতার কারণে অনেক সময় দলিল রেজিস্ট্রার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। অনেক সময় আইনের মার-প্যাঁচের কারণে সাব-রেজিস্ট্রাররা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তখন সেবাপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন। এই ধরনের পুরোনো সমস্যাটি সমাধানে ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিসে নিয়ে এসেছেন সাবিকুন নাহার। যে কেউ দলিল রেজিস্ট্রি করতে এসে আইনের অস্পষ্টতার কারণে প্রত্যাখিত হলে সরাসরি জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে যেতে পারেন। তিনি আইনকানুন পর্যালোচনা করে সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে পরামর্শ করে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।
নিবন্ধন কার্যকমে অনিয়ম দুর্নীতি কমেছে এমন মন্তব্য করে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার সাবিকুন নাহার আরটিভি নিউজকে বলেন, জেলা রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব গ্রহণের পর পরেই অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তি দূর করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। এতে করোনার মধ্যেও সরকারের রাজস্ব আয় অব্যাহত রাখতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, মানুষ জমি কেনাবেচা করতে আগের মতো আর ভোগান্তির শিকার হয় না। কোনো সেবাপ্রার্থী জমি বিক্রি কিংবা কিনতে এসে সমস্যায় পড়লে সরাসরি আমার দপ্তরে আসতে পারেন। একজন জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে সেবাপ্রার্থীদের জন্য সার্বক্ষণিক দরজা খোলা।