বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৫ , ০৮:৪৯ এএম
২২ অক্টোবর, ১৯৫৪ সাল। কলকাতার এক হাসপাতালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত কবি জীবনানন্দ দাশ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি জীবনাবসান ছিল না, এটি ছিল বাংলা কাব্যধারায় এক যুগের নীরব সমাপ্তি। নির্জনতম এই কবিকে তার প্রয়াণ দিবসে স্মরণ করতে গিয়ে আমরা ফিরে দেখি তার জীবন, সাহিত্য ও সেই গভীর নির্জনতার দিকে, যা তার কবিতাকে এক অমর মর্যাদা দিয়েছে।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বরিশাল শহরে এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জীবনানন্দ দাশের জন্ম। তার বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও ব্রাহ্ম সমাজের নেতা এবং মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন সেকালের একজন সুপরিচিত কবি (‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে...’ কবিতাটির রচয়িতা)। এই সাহিত্যিক আবহে বেড়ে ওঠায় শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি তার এক অনন্য সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় বরিশালের ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজে। এরপর তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি আইন কলেজে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেননি। তার প্রথম কবিতা ‘বর্ষ-আবাহন’ প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে ব্রহ্মবাদী পত্রিকায়। ১৯২৭ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশের পর তিনি নিজের পদবি ‘দাশগুপ্ত’ বাদ দিয়ে কেবল ‘দাশ’ লিখতে শুরু করেন, যা তার স্বতন্ত্র পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়।
জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিজীবন ছিল পেশাগত অনিশ্চয়তা, তীব্র আর্থিক সংকট এবং গভীর নিঃসঙ্গতায় মোড়া। প্রধানত শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও তাকে গৃহশিক্ষকতা থেকে শুরু করে বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসেবেও কাজ করতে হয়েছে। তিনি অধ্যাপনা করেছেন কলকাতা সিটি কলেজ, বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ, দিল্লির রামযশ কলেজ এবং বরিশালের ব্রজমোহন কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানে। বাইরের জগৎ তাকে গম্ভীর, নির্জন ও স্বপ্নলোকবাসী হিসেবে দেখলেও, ভেতরের মানুষটি ছিল জটিল ও কৌতুকপ্রিয়। তার বোন সুচরিতা দাশের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তিনি উচ্চকিত হাসি হাসতে পারতেন এবং কাছের মানুষদের সঙ্গে হাসি-পরিহাসে মেতে উঠতেন। তবে তার গভীর বেদনা ও সংগ্রাম ধরা পড়ে তার ডায়েরি ও অপ্রকাশিত সাহিত্যে।
১৯৩০ সালে তিনি লাবণ্য গুপ্তকে বিবাহ করেন। এই দাম্পত্য জীবনেও ছিল চরম জটিলতা। তার ডায়েরি থেকে জানা যায় হতাশা ও এমনকি আত্মহত্যার চিন্তাও। সমালোচকদের মতে, তার উপন্যাস ‘মাল্যবান’-এর প্রধান চরিত্র মাল্যবান ও উৎপলার অসুখী সম্পর্কের মধ্যে কবির নিজস্ব জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে, যে কারণে লাবণ্য দাশ এই উপন্যাস প্রকাশে বাধা দিয়েছিলেন।
জীবনানন্দ দাশকে রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কাব্যে আধুনিকতার অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘শুদ্ধতম কবি’ ও ‘চিত্রকল্পের কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশের পর থেকেই তিনি বাংলা কাব্যভাষাকে এক নতুন দিগন্ত দান করেন। তার শব্দচয়ন, উপমা ও চিত্রকল্পের অভিনবত্ব সে যুগে অনেক সমালোচককে বিব্রত করলেও, সময়ের ব্যবধানে তা-ই হয়ে ওঠে বাংলা কবিতার অমূল্য সম্পদ। তার কবিতায় দেখা মেলে বাংলার চিরায়ত রূপের—ধানসিঁড়ি নদী, হোগলা, নিম, সজনে, ধুন্দল, শালিক পাখি ও কাকের মতো সাধারণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তিনি জীবনের গভীর দর্শন খুঁজেছেন। তার বিখ্যাত উক্তি, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’, তার এই গভীর প্রকৃতিপ্রেমেরই স্বাক্ষর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার কবিতাকে ‘চিত্ররূপময়’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
জীবনানন্দ দাশের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা হিসেবে বিবেচিত। এই কবিতাটি শুধু প্রেমের নয়, এটি ক্লান্ত মানবসত্তার চিরশান্তি ও আশ্রয়ের প্রতীকী প্রতিচ্ছবি। কবি নিজেকে এখানে এক নিঃসঙ্গ পথিক হিসেবে কল্পনা করেছেন, যিনি হাজার বছর ধরে ‘বিম্বিসার-অশোকের ধূসর জগতে’ ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং অবশেষে নাটোরের বনলতা সেনের চোখে ‘দুদণ্ড শান্তি’ লাভ করেছেন। বনলতা সেন চরিত্রটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক থাকলেও, তিনি মানব জীবনের আত্মিক মুক্তি ও চিরশান্তির প্রতীক হিসেবেই সর্বজনস্বীকৃত।
জীবনানন্দ দাশ মূলত কবি হলেও, তিনি ২১টি উপন্যাস ও ১২৬টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন, যার প্রায় সবকটিই তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এই অপ্রকাশিত গদ্যগুলো কবির অন্তর্মুখী জীবন, দাম্পত্যের টানাপোড়েন এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের এক প্রামাণিক দলিল। তার ‘কারুবাসনা’ উপন্যাসেই বনলতা সেন নামটি প্রথম উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়াও ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, এবং মরণোত্তর প্রকাশিত ‘রূপসী বাংলা’ ও ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম।
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জীবনানন্দ দাশের জীবনাবসান হয় ২২ অক্টোবর। যদিও এই ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল নাকি কবির ‘স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রয়াস’—তা নিয়ে আজও বিতর্ক বিদ্যমান। গত শতকে কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় একমাত্র মৃত্যুবরণকারী মানুষ ছিলেন জীবনানন্দ দাশই। তার মৃত্যু ছিল বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তিনি নিজেই যেন জানতেন—বাংলার মাটি, নদী, কুয়াশা আর গ্রামীণ জীবন থেকে তার অস্তিত্ব কখনও মুছে যাবে না। তার সেই বিখ্যাত পঙক্তি—‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’—আজও প্রতিটি বাংলাভাষী পাঠকের হৃদয়ে এক চিরন্তন প্রত্যাশা হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। জীবনানন্দ দাশ শুধু একজন কবি নন; তিনি বাংলা প্রকৃতির স্থির, দীর্ঘস্থায়ী এক প্রতিচ্ছবি—নিঃসঙ্গ অথচ প্রেমে পরিপূর্ণ, নিরব অথচ গভীর। তার সাহিত্য আজও আমাদের অস্তিত্বের অর্থ অনুসন্ধানের প্রেরণা জোগায়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি