images

শিল্প-সাহিত্য

মৌমাছির মতো মানুষ

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫ , ০৮:৪৩ পিএম

রফিকের জীবনটা খুবই সাধারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এখন একটা ছোট এনজিওতে চাকরি করে। অফিসে তার দায়িত্ব  ‘কমিউনিটি হেলথ প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর’। নাম শুনতে বড়, কাজটা ছোট। গ্রামে গিয়ে মানুষকে বুঝানো-নোংরা পানি খেও না। বাচ্চার টিকা দাও। একটু সাবান-পানি ব্যবহার করো।

রফিকের সহকর্মীরা বলে, তুই অনেক বেশি ভাবিসরে। এই দেশে মানুষকে পরিষ্কার থাকতে শেখানো মানে নদী শুকিয়ে ফুল চাষ করার মতো!

রফিক শুধু হাসে। সে ভাবে, হয়তো একদিন একটা ফুল ফুটবেই। সেই ফুলটাই একদিন ফুটেছিল। মেহরীন নামের এক মেয়ে। প্রথম দেখা এক কনফারেন্সে। ঢাকার এক হোটেলে ‘রুরাল হেলথ ডেভেলপমেন্ট’ নিয়ে সেমিনার ছিল। মেহরীন সেখানে গবেষক হিসেবে এসেছিল। সাদা শাড়ি। নীল বর্ডার, চুল বাঁধা, একটা সাধারণ খোঁপা। রফিক তাকিয়েছিল একবার। তারপর আবার তাকিয়েছিল। তারপর আর চোখ সরাতে পারেনি।

সেমিনারের পরে সে এগিয়ে গিয়ে বলেছিল, আপনি কি মেহরীন রহমান? হ্যাঁ (হালকা হাসি)। আমি কি আপনার চেনা কেউ? না, তবে আপনি চাইলে চেনা হতে পারি। আহা! এই ডায়লগটা পুরোনো! রফিক লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু সেই হাসিটা সারাদিন থেকে গিয়েছিল মনে। 

দুই সপ্তাহ পর অফিস থেকে রফিককে পাঠানো হলো মানিকগঞ্জের এক গ্রামে। পানি দূষণ নিয়ে গবেষণা করতে। সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে দেখল, ওই একই প্রকল্পে কাজ করছে মেহরীন রহমান। মেহরীন একটু অবাক হয়ে বলেছিল, আবার দেখা হলো! আপনি কি সব জায়গায় হাজির থাকেন নাকি? 

না, আমি কেবল ভাগ্যবান। ভাগ্যবান? আপনি তো আছেন। মেহরীন হেসেছিল। তখন সূর্য ডুবছিল। পাখিরা ফিরছিল। দুইজনের মধ্যে একটা নিরবতা নেমে এলো। কিন্তু সেটা অস্বস্তিকর নয় বরং মিষ্টি, অনির্বচনীয়। রফিকের মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব ছিল। সে কখনও রাগ করত না। কখনও গালাগালি করত না। গ্রামের বাচ্চাদের সে গল্প শোনাতো- ‘মৌমাছি ফুলে বসে, কিন্তু ফুলকে কষ্ট দেয় না।’ শিশুরা মুগ্ধ হয়ে শুনত। 

মেহরীন একদিন বলল, আপনি কি কখনও রাগ করেন না? করি, তবে নিজের ওপর। অন্যের ওপর না? না, মানুষ তো ভুল করবেই। আমি ঠিক করি না, ফুলে বসা মৌমাছি যেমন ফুলকে আঘাত করে না। মেহরীন চুপ করে ছিল। সেই রাতে তার ঘুম আসেনি।

সে নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল, রফিক নামের মানুষটা হয়তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে।

দিন কেটে যাচ্ছিল। একসাথে মাঠে কাজ। সারাদিন গরম। ঘামে ভেজা শরীর। তারপর সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে বসে চা খাওয়া। মেহরীন লক্ষ্য করত, রফিক চায়ের কাপ ফেলে দেয় না, বরং ভালোভাবে ধুয়ে রাখে। একদিন সে জানতে চাইল, আপনি এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কেন? রফিক হাসল, পৃথিবীটা কারও না, তাই নোংরা করার অধিকারও আমাদের না। এই এক বাক্যেই মেহরীন যেন হার মানল। 

সে ভাবল, এই মানুষটার মধ্যে একটা অদ্ভুত পবিত্রতা আছে, যা তাকে প্রতিদিন আরও কাছাকাছি টানে। এক রাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ছিল। বিদ্যুৎ নেই। মেহরীন একা বসে জানালার ধারে। রফিক দরজায় নক করল। মেহরীন, ঠিক আছো? হ্যাঁ, কিন্তু ভয় লাগছে একটু। ভয় পেও না, আমি বাইরে আছি। বৃষ্টির শব্দে আরেকটা নীরবতা তৈরি হলো।

বাইরে শুধু রফিকের কণ্ঠ, বৃষ্টি হলে পৃথিবী ধুয়ে যায়। কিন্তু আমাদের মনও কি ধুয়ে যায়? মেহরীন বলল, মন ধোয়া যায় না, মন শুধু কারও জন্য ভিজে যায়। রফিক তখন হাসল। সেই হাসিতে মেহরীনের বুকের ভেতর অচেনা কাঁপুনি।

কাজ শেষ হওয়ার পর তাদের ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা। শেষ দিনটিতে রফিক তাকে বলল, আমি হয়তো তোমাকে আর দেখব না। কেন? আমি অন্য জেলায় যাচ্ছি। কিন্তু যোগাযোগ রাখবে তো? রাখব, যদি তুমি চাও। আমি চাই। তারা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। 

বিদায় মুহূর্তে মেহরীন বলেছিল, তুমি ঠিক মৌমাছির মতো, রফিক। যা পাও, পবিত্র করে রাখো; যা দাও, তাও পবিত্র। আমি চাইতাম তোমার মতো হতে। রফিক শুধু বলেছিল, তুমি তো আমার ফুল।

এরপর ছয় মাস কেটে যায়। রফিকের কোনো খবর নেই। ফোন বন্ধ। মেহরীন দিন কাটায় কাজের ভেতর, কিন্তু সবকিছুর মাঝেই ফাঁকা একটা জায়গা রয়ে যায়। 

একদিন ডাক আসে মানিকগঞ্জ থেকে— আপনার সহকর্মী রফিক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। মেহরীন সব ছেড়ে ছুটে যায়। গ্রামীণ হাসপাতালের ছোট্ট বিছানায় রফিক শুয়ে আছে। মুখে ব্যান্ডেজ, হাত ভাঙা। তুমি এলে? আমি না এলে কে আসবে? আমি ভেবেছিলাম তুমি ব্যস্ত। ভালোবাসার মানুষ ব্যস্ত হয় না। রফিক মৃদু হাসল। তার চোখে পানি, কিন্তু ঠোঁটে শান্তি। সেই রাতে মেহরীন বসে ছিল রফিকের পাশে।

রফিক বলল, জানো, আমি ভেবেছিলাম, আমি আর বাঁচব না। এখন তো বেঁচে আছো। হ্যাঁ, কারণ তুমি এলে। নাটক করো না, ঘুমাও। রফিক চোখ বন্ধ করে বলল, মৌমাছি যদি ফুলের কাছে মধু না পায়, সে অন্য ফুলে যায়। কিন্তু আমি পারি না। আমি শুধু তোমার কাছেই উড়তে পারি। মেহরীন তখন কিছু বলল না। তার চোখ ভিজে উঠল।

রফিক সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরল। তাদের সম্পর্ক তখন অন্যরকম এক পরিণতির দিকে। তারা প্রতিদিন কথা বলত, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করত। হঠাৎ কখনো কখনো দেখা করত টিএসসিতে। 

একদিন মেহরীন বলল, তুমি কি কখনও ভেবেছ, আমাদের সম্পর্কটা কী? ভেবেছি। ফলাফল? আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব সোজা করে বললে। ভালোবাসা জটিল করলে সেটা রাজনীতি হয়ে যায়। মেহরীন চুপ করল। তার মনে হলো, পৃথিবীতে এই মানুষটার মতো সহজ কিছু আর নেই। সময় কেটে যায়। 

একদিন মেহরীন জানতে পারে, তার বাবা তার জন্য একজন প্রবাসী ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছেন। ছেলেটা ধনী, পরিশীলিত, কিন্তু মেহরীনের মনে ঝড় ওঠে। সে ফোন করে রফিককে। আমি কি তোমার জীবনে কিছু? সবকিছু। তাহলে বিয়ে আটকাবে? আটকাবো না। কেন? মৌমাছি ফুলে জোর করে বসে না। ফুল নিজে তাকে ডাকলে তবেই যায়।

মেহরীনের গলা কাঁপছিল, তুমি পাগল, রফিক। হ্যাঁ, তোমার জন্যই। বিয়ের আগের দিন মেহরীন আর থাকতে পারল না। রাত তিনটায় সে রফিকের বাসায় চলে গেল। ঢাকা শহর নিস্তব্ধ। রফিক দরজা খুলে চমকে গেল, তুমি? হ্যাঁ, আমি পালিয়ে এসেছি। পাগল নাকি? হ্যাঁ, তোমার মতোই। 

দুজন কিছুক্ষণ নীরব। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, জানালায় টুপটাপ শব্দ। রফিক বলল, বৃষ্টি মানে পরিশুদ্ধতা, তাই না? মেহরীন বলল, হ্যাঁ, আজ থেকে আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, চিরকাল। রফিকের চোখে পানি এসে গেল। সে মৃদু কণ্ঠে বলল, মৌমাছি ফুলের মধু নেয়, কিন্তু ফুলকে আঘাত দেয় না। আমি তোমার জীবনে থাকব, কিন্তু কখনো তোমাকে কষ্ট দেব না। তারা একে অপরের হাত ধরল।

পরদিন সকালে খবর ছড়াল মেহরীন বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, সমাজ হাসল, আত্মীয়রা নিন্দা করল। কিন্তু রফিক সবকিছু নীরবে সামলাল। মেহরীনের বাবার কাছে গিয়ে বলল, আমি জানি, আপনি রাগ করেছেন। তুমি আমার মেয়েকে বিপথে এনেছ! না, আমি শুধু তার মনের পথটা দেখিয়েছি। বৃদ্ধ মানুষটা চুপ করে ছিল। রফিক বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি বললেন, তুমি কি তাকে ভালোবাসো? হ্যাঁ, কিন্তু আমি তাকে দখল করতে চাই না, কেবল পাশে থাকতে চাই। বৃদ্ধ মানুষটি মাথা নিচু করে বললেন, যাও, ওকে সুখী করো।

এক বছর পরে রফিক আর মেহরীন বিয়ে করল। তাদের ঘর ছিল ছোট্ট, কিন্তু পরিপূর্ণ আলোয় ভরা। রফিক প্রতিদিন সকালে বারান্দায় বসে মেহরীনের জন্য এক কাপ চা বানাতো। আর মেহরীন প্রতিদিন বলত, তুমি ঠিক মৌমাছির মতো। রফিক হাসত, আর তুমি আমার ফুল।

তবে জীবন কখনও পুরোপুরি সুখের হয় না। একদিন রফিকের ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। চিকিৎসা চলে, কিন্তু অবস্থার অবনতি হয়। হাসপাতালের বিছানায় রফিকের চোখে মৃদু হাসি। মেহরীন কান্নায় ভেঙে পড়েছে। রফিক বলল, কেঁদো না, মেহরীন। তুমি ছাড়া আমি বাঁচব না। বাঁচবে, কারণ তুমি আলো। একটু থেমে বলল, মৌমাছি ফুলের জীবন বাড়ায়, নিজে না থেকেও। আমি চলে গেলেও, তোমার ভিতরে আমার মধু রয়ে যাবে। মেহরীন তখন ফুঁপিয়ে উঠল। 

রফিক মারা যায় এক ভোরবেলায়, পাখির ডাকের আগে। তার হাতের মুঠোয় ছিল এক টুকরো কাগজ। সেখানে লেখা ছিল, দুনিয়ায় মৌমাছির মতো হও, যা খাও তা পবিত্র, যা দাও তা পবিত্র, আর কারও কিছু নষ্ট কোরো না।

মেহরীন সেই কাগজটা প্রতিদিন পড়ে। বৃষ্টির দিনে, রোদেলা দুপুরে, একাকী রাতেও।

দশ বছর পর— মেহরীন এখন মানিকগঞ্জে একটা ছোট স্কুল চালায়। তার ছাত্ররা ফুলে বসা মৌমাছির ছবি আঁকে। কেউ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আপা, আপনি কেন মৌমাছিকে এত ভালোবাসেন? মেহরীন হেসেছিল। তার চোখে পানি চিকচিক করছিল।

সে বলেছিল, কারণ মৌমাছির মতো মানুষ একবার জীবনে পেলে, পুরো পৃথিবীটাই মধুময় হয়ে যায়।

আরটিভি/একে