images

শিল্প-সাহিত্য

প্রতিবাদের কলমের সাহসী কণ্ঠ 'আহমদ ছফা'র আজ জন্মদিন

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ , ১১:৪৮ এএম

বাংলা সাহিত্যে তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী নাম। লেখক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, কবি, অনুবাদক, গবেষক এবং সর্বোপরি একজন স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদ। সত্য উচ্চারণে কখনো আপস করেননি। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট—সবকিছুই তিনি তুলে এনেছেন তাঁর লেখায়। বাংলা সাহিত্যের সেই শক্তিশালী কণ্ঠস্বর আহমদ ছফার জন্মদিন আজ।

১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আহমদ ছফা। শৈশব থেকেই সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু করেন এবং অল্প সময়েই নিজস্ব চিন্তা ও সাহসী বক্তব্যের জন্য সাহিত্যাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি পান।

সত্য বলার সাহস ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়

আহমদ ছফা বিশ্বাস করতেন, একজন লেখকের প্রধান দায়িত্ব হলো সত্যকে নির্ভয়ে তুলে ধরা। জনপ্রিয়তা বা সমালোচনার ভয় তিনি কখনো করেননি। ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার না করে বরাবরই সমাজের অসঙ্গতি, বৈষম্য, ভণ্ডামি ও সাংস্কৃতিক সংকট নিয়ে লিখেছেন।

তাঁর লেখায় যেমন ছিল সাধারণ মানুষের জীবন, তেমনি ছিল রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিজীবী সমাজের গভীর বিশ্লেষণ।

যে বইগুলো আজও সমান জনপ্রিয়

আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের পরিধি ছিল বিস্তৃত। উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিকথা, শিশুতোষ রচনা—সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে— অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী, ওঙ্কার, পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ, যদ্যপি আমার, গুরু, গাভী বিত্তান্ত, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস, বাঙালি মুসলমানের মন, জাগ্রত বাংলাদেশ, নিখোঁজ সংবাদ, সূর্য তুমি সাথী, রাজনীতির লেখা ও প্রবন্ধসংগ্রহ (বিভিন্ন সংকলনে প্রকাশিত)। 

আরও পড়ুন
8547

চলচ্চিত্রে চীনের সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন তুলে ধরলেন অধ্যাপক তু ইং

এর মধ্যে 'অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী' বাংলা উপন্যাসের এক অনন্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে 'যদ্যপি আমার গুরু' বইয়ে তিনি ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে ঘিরে এক অসাধারণ স্মৃতিকথা লিখেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।

'বাঙালি মুসলমানের মন' কেন এত আলোচিত?

আহমদ ছফার সবচেয়ে আলোচিত প্রবন্ধগ্রন্থগুলোর একটি 'বাঙালি মুসলমানের মন'। এই গ্রন্থে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের ইতিহাস, মানসিকতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সংকট নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন।

প্রকাশের পর বইটি যেমন প্রশংসিত হয়, তেমনি নানা বিতর্কেরও জন্ম দেয়। তবে আজও এটি বাংলা ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাজ-ভাবনার বই হিসেবে বিবেচিত।

'গাভী বিত্তান্ত' এখনো প্রাসঙ্গিক

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তুলে ধরেছেন 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসে। প্রকাশের বহু বছর পরও বইটি নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে সমানভাবে আলোচিত।

রবীন্দ্রনাথ থেকে লালন—সবখানেই ছিল তাঁর আগ্রহ

আহমদ ছফা শুধু কথাসাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন, বাঙালির ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় নিয়েও গভীরভাবে লিখেছেন। তাঁর লেখায় ইতিহাস, দর্শন ও সমাজচিন্তার এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।

পুরস্কারের চেয়ে বড় ছিল পাঠকের ভালোবাসা

জীবদ্দশায় আহমদ ছফা অনেক সম্মাননা পেলেও তিনি কখনো পুরস্কারের জন্য লেখেননি। স্বাধীন চিন্তা, যুক্তিবাদ এবং সাহসী অবস্থানের কারণে তিনি সব সময়ই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে।

২০০১ সালের ২৮ জুলাই ঢাকায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর চিন্তা, দর্শন ও সাহিত্য আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।

আজও কেন প্রাসঙ্গিক আহমদ ছফা?

সমাজ, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের মুক্তচিন্তা নিয়ে তাঁর প্রশ্নগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নতুন প্রজন্মের কাছে আহমদ ছফা শুধু একজন সাহিত্যিক নন; তিনি একজন চিন্তার দিশারি, যিনি সত্যকে নির্ভয়ে বলার সাহস শিখিয়েছেন।

তাঁর জন্মদিনে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন এই প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদকে। তাঁর লেখা নতুন পাঠকদের হাতে পৌঁছাক, তাঁর মুক্তচিন্তার আলো আরও বিস্তৃত হোক—জন্মদিনে এটাই প্রত্যাশা।


আরটিভি/জেএমএ