মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:০৪ পিএম
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বিদেশি পর্যটক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীরা। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ এলাকায় তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
লাল-সাদা পোশাকে সেজে বিদেশিরা শোভাযাত্রার রঙিন আবহে মিশে যান। কেউ ক্যামেরাবন্দি করেন বর্ণিল মুহূর্ত, কেউবা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠেন। অনেককে আবার বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সাজে—নারীদের কপালে লাল টিপ, খোঁপায় ফুল, হাতে-মুখে আলপনার নকশায়— উৎসবের অংশ হয়ে উঠতে দেখা গেছে। কারও হাতে লেখা ছিল ‘এসো হে বৈশাখ’।
জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তারা এই আয়োজন উপভোগ করতে ঢাকায় এসেছেন। কেউ দূতাবাসে কর্মরত, আবার কেউ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে শোভাযাত্রা কাভার করতে এসেছেন।
লন্ডন থেকে আসা চার্লস নোড বলেন, বাংলাদেশ ও এখানকার মানুষের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পেরে দারুণ লাগছে।
ভারতের ত্রিপুরা থেকে আগত নয়ন ভার্মা বলেন, আমাদের দেশেও বৈশাখ পালিত হয়, তবে বাংলাদেশের মতো এত বড় ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন খুব কমই দেখা যায়।
রাশিয়া থেকে আসা এক ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকের ভাষ্য, বিশ্বের সামনে এমন ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলে ধরা জরুরি। ঢাকার এই শোভাযাত্রা সত্যিই অনন্য।
সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর ও বেগম রোকেয়া হল এলাকা প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়। পুরো এলাকা পরিণত হয় এক উৎসবমুখর মিলনমেলায়।
শোভাযাত্রার শুরুতে মহানগর পুলিশের ১০টি ঘোড়সওয়ার দল অংশ নেয়। এরপর জাতীয় পতাকা বহন করে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর একটি দল। মূল ব্যানারসহ বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নগরবাসী এতে অংশ নেন।
আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পাঁচটি বড় মোটিফ—মোরগ, বেহালা, শান্তির পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। পাশাপাশি প্রায় ৪০ জন শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা এবং ১৫০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রের স্ক্রল শোভাযাত্রায় যোগ করে বিশেষ মাত্রা।
দেশের ১০টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধির অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার বার্তা ফুটে ওঠে বিভিন্ন শিল্পকর্মে।
ইউনেস্কো স্বীকৃত এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। সাদা-লাল পোশাকে সজ্জিত হাজারো মানুষ চারুকলা এলাকায় সমবেত হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
শোভাযাত্রাকে ঘিরে চারুকলা এলাকা ও আশপাশের সড়কে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরাও দায়িত্ব পালন করেন।
সব মিলিয়ে এবারের নববর্ষ উদযাপন শুধু একটি উৎসব নয়— এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রদর্শনী। দেশি-বিদেশি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র যেন রূপ নেয় এক বিশ্বজনীন উৎসবের মঞ্চে।
আরটিভি/এমএইচজে