images

রাজধানী

ঢাকার রাস্তায় এআই ট্রাফিক, লালবাতিতেই থামছে যানবাহন

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ , ০৮:৫৮ পিএম

মাত্র এক থেকে দেড় মাস আগেও যেখানে সিগন্যাল অমান্য করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা সেখানে এখন রাজধানীর ব্যস্ততম মোড়গুলোতে লালবাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সব যানবাহন থেমে যাচ্ছে। ডিএমপির এআই ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর পর এ পরিবর্তন নগরবাসীর চোখে দৃশ্যমান হচ্ছে।

রাজধানীর সোনারগাঁও মোড় সার্ক ফোয়ারা চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ট্রাফিক কনস্টেবল নুর মোহাম্মদ। কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও কাঁঠালবাগান এলাকার ব্যস্ততম এই ট্রাফিক মোড়ে তিনি অনেকটা নির্ভার পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঈদের পঞ্চম দিনে যানবাহনের চাপ খুব বেশি না হলেও খুব কমও ছিল না।

তবে নুর মোহাম্মদ স্বস্তিতে থাকলেও চারদিক থেকে আসা যানবাহন নিয়ম মেনে হলুদ, সবুজ ও লাল- সব ধরনের ট্রাফিক সিগন্যাল অনুসরণ করে চলছিল। বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলসহ কোনো যানবাহনের চালকই জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন না।

শুনতে অনেকটা গল্পের মতো মনে হলেও সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। এআই ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্রাফিক কনস্টেবল নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘ব্যস্ততম এ সড়কে মাসখানেক আগেও যানবাহন সামলাতে গলদঘর্ম হতে হতো। অনেকেই ট্রাফিক সিগন্যাল মানতেন না। জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতেন।’

তিনি বলেন, ‘এ ব্যবস্থার কারণে সবারই সুবিধা হয়েছে। আমাদের যেমন সুবিধা হয়েছে তেমনি জনগণেরও হয়েছে। তারা এখন সিগন্যাল মেনে নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়াচ্ছে, আবার চলাচল করছে। যানবাহনের চাপের ওপর ভিত্তি করে সিগন্যালের সময়ও নির্ধারণ করা হচ্ছে।’

তার মতে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা ও জরিমানার আশঙ্কাই সিগন্যাল মানার অন্যতম প্রধান কারণ।

নুর মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘অনেকে নিয়ম মানলেও ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক চালক এখনো এআই ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না। তারা অনেকেই আগের মতো সিগন্যাল অমান্য করছেন। তাদের সচেতন করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

সোমবার (০১ জুন) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগসংলগ্ন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিং, বাংলামোটর ও সোনারগাঁও ক্রসিংয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, বেশির ভাগ যানবাহন এক থেকে দেড় মিনিটের ট্রাফিক সিগন্যাল মেনেই চলছে। দু-একটি গাড়ি রাস্তা ফাঁকা দেখে এগিয়ে এলে ট্রাফিক পুলিশ তাদের থামিয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করে সতর্ক করে দিচ্ছেন।

এসব সিগন্যাল পয়েন্টে পথচারীদের জন্যও পৃথক সিগন্যাল রয়েছে। তবে সোমবার দুপুরে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রসিংয়ে কয়েকজন পথচারীকে লালবাতি জ্বলা অবস্থায়ও রাস্তা পার হতে দেখা যায়। কারণ জানতে চাইলে হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফরিদ হোসেন বলেন, ‘অনেক দিনের অভ্যাস। তাই রাস্তা ফাঁকা দেখে চলে এসেছি।’

বাংলামোটর সিগন্যাল ক্রসিংয়ের একপাশে দুই ট্রাফিক পুলিশকে খোশগল্প করতে দেখা যায়। তবে তারা কথোপকথনে ব্যস্ত থাকলেও সব ধরনের যানবাহন সিগন্যাল মেনেই সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছিল।

ইস্কাটনের বাসিন্দা গৃহবধূ নাসরীন আক্তার বলেন, ‘শুধু আইন থাকলেই হয় না, আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থাও থাকতে হয়। এআই-নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা তার বড় উদাহরণ।’

মাঠপর্যায়ে কর্মরত একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, আগে ট্রাফিক সিগন্যাল মানা ও না মানা নিয়ে যানবাহনের চালক ও মালিকদের সঙ্গে নানা তর্ক-বিতর্ক হতো। এখন ক্যামেরায় সবকিছু ধারণ হওয়ায় সেই ঝামেলা নেই। ফলে তাদের কাজও অনেক সহজ হয়েছে।

জানা গেছে, এসব আধুনিক ক্যামেরা লালবাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন বা জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, লেন ভঙ্গ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের মতো নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে। এরপর গাড়ির নম্বরপ্লেট স্ক্যান করে সরাসরি গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে ডিজিটাল মামলার তথ্য ও জরিমানার নোটিশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এ ব্যবস্থা চালু হয়। প্রযুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর থেকে গত ২৩ মে পর্যন্ত ট্রাফিক বিভাগ যাচাই-বাছাই শেষে ৬১১টি মামলা করে। এর আগে ১১ মে পর্যন্ত প্রথম এক সপ্তাহেই ৩০০টির বেশি মামলা করা হয়।

আরও পড়ুন
875000

ডগ স্কোয়াড নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে র‍্যাব-পুলিশ-ডিএনসির অভিযান

জানা গেছে, রাজধানীর প্রায় ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্ট বা সিগন্যালে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ক্যামেরা ও নজরদারি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর অন্তত ৫০০টি সিগন্যালে এই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।

গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক ক্রসিংগুলোর মধ্যে রয়েছে শাহবাগ মোড়, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট। এছাড়া উত্তরা বিমানবন্দর সড়ক এবং মহাখালী বাস টার্মিনালসংলগ্ন সিগন্যালেও এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

গত ২০ মে ডিএমপির নবনিযুক্ত কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ইন্টারসেকশনগুলোতে আধুনিক এআইচালিত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, অবৈধ পার্কিং কিংবা লেন পরিবর্তনের মতো মোটরযান আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ যাচাই করে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিআরটিএর ডাটাবেজ ব্যবহার করে গাড়ির মালিকের ঠিকানায় সরাসরি নোটিশ বা প্রসিকিউশন পাঠানো হচ্ছে।’

ডিএমপি কমিশনারের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার ফলে চালক ও পথচারীদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বছরের পর বছর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এবার প্রযুক্তির সহায়তায় সেই চেনা দৃশ্যে কিছুটা পরিবর্তনের আভাস মিলছে। পরিবর্তনটি কতটা স্থায়ী হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে লালবাতি জ্বলে উঠলে থেমে যাচ্ছে যানবাহন এটিই নগরবাসীর জন্য নতুন বাস্তবতা।

আরটিভি/ এসকেডি