images

রাজধানী

জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল ‘তোমরা কারা’, উত্তরে করে গুলি

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১০:৩৪ পিএম

রাজধানী মিরপুরের কাফরুল এলাকায় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে ইউসুফ আলী (৪৫) নামে এক যুবদল কর্মী নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর-১৩, ই-ব্লক, ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত ইউসুফ আলীর গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার সাকরাল গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত শাহজাহান। তিনি পরিবার নিয়ে মিরপুরের কাফরুলে বসবাস করতেন। 

নিহতের রাজনৈতিক সহকর্মী মামুন বলেন, রাত ১১টার দিকে আমি ইউসুফ ভাইসহ আরও দুই জন সহকর্মী মিরপুর-১৩, ই-ব্লক, ওপেক্স গার্মেন্টসের সামনে চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমাদের তিনজনকে লক্ষ্য করে অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন যুবক আশপাশে ঘুরছিল। তাদের গতিবিধি দেখে আমাদের সন্দেহ হয়। 

এক পর্যায়ে ইউসুফ ভাই তাদের ডেকে বলেন, ‘তোমরা কারা, তোমাদের বাসা কোথায়? তোমরা আমাদেরকে ঘিরে এভাবে ঘুরছ কেন?’ 

উত্তরে তারা জানায় তাদের বাড়ি মিরপুর ১০-এ। 

এরপর তারা চলে যেতে চাইলে ইউসুফ ভাই একজনকে বলেন, ‘দাঁড়াও’। 

এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ওই যুবককে ইউসুফ ভাই জাপটে ধরলে সে কোমর থেকে পিস্তল বের করে তার বুকে ঠেকিয়ে গুলি করে। এতে ইউসুফ ভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা গুলি করতে করতে পালিয়ে যাওয়ার সময় আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে আমরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাদের দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইউসুফ ভাইকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ অন্য দুজনের মধ্যে একজনের মাথায় এবং অন্যজনের পায়ে গুলি লাগে। তারা এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

মামুন বলেন, ঘটনার পর স্থানীয় জনতা একজনকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। পরে তার নাম জানা যায় চঞ্চল।

নিহতের বড় ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, শেখ হাসিনার আমলে আমার ভাই যদি গুলি খেত, তাহলে এত খারাপ লাগত না। এখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকার পরও যদি একজন যুবদল কর্মীর এভাবে মৃত্যু হয়, তা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।

কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান বাবু বলেন, আমি কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। একটি ছেলে আমার সামনে দিয়ে দুইবার যাতায়াত করলেও বিষয়টি আমি আমলে নেইনি। 

আরও পড়ুন
seikh-hasina-house

ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার পরিত্যক্ত বাসভবন থেকে মরদেহ উদ্ধার 

ইউসুফ তখন সুজন নামে একজনকে বলছিল, ‘এই ছেলেগুলোর গতিবিধি সন্দেহজনক, ভাইকে একটু নক দে’।

তখন সুজন ফোন করে বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাপ পরা এক যুবককে চেনেন কি না তা আমার কাছে জানতে চান। আমি তাদের চিনি না বলে জানাই। পরে আরও দুই যুবকের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাদের কাউকেই চিনতে পারছিন না বলে জানাই। ফোনে কথা বলার সময় ক্যাপ পরা যুবকের সঙ্গে আমার চোখাচোখি হয়। এরপর ওই ব্যক্তি দ্রুত সরে যেতে শুরু করলে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়।

হাফিজুর রহমান বলেন, তখন আমি সুজনকে ওই যুবকদের আটক করার চেষ্টা করতে বলি। পরে সুজন, ইউসুফ ও মামুন এগিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চান। তখন তারা জানায় তাদের বাসা মিরপুর ১০ নম্বরে। এক পর্যায়ে ক্যাপ পরা যুবক কোমরের দিকে হাত দিলে ইউসুফ তাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করেন। এ সময় ওই যুবক খুব কাছ থেকে ইউসুফের বুকে গুলি করে। ইউসুফ মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারী আরও দুই রাউন্ড গুলি চালায়। এ ঘটনায় কাছাকাছি থাকা একজন পথচারী ও একজন সবজি বিক্রেতা গুলিবিদ্ধ হন।

তিনি বলেন, পরে মামুন একটি কাঠের টুল ছুড়ে মারলে হামলাকারীরা পালানোর চেষ্টা করে। তাদের ধাওয়া করা হলে তারা আরও কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। পরে সেখান থেকে চঞ্চল নামে একজনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়। আমি সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে জানালে তারা এসে ওই যুবককে হেফাজতে নেয়।

কী কারণে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল বা কোনো কোন্দল ছিল কি না জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বাবু বলেন, আমার সঙ্গে কারও কোন্দল নেই। অন্য কেউ আমাকে পথের কাঁটা ভাবছে কি না সে বিষয় তো আর আমি বলতে পারবো না। আমাকে হত্যা করার জন্য ঝিনাইদহ থেকে চারজন শুটারকে ভাড়া করা হয়েছিল।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হাফিজুর রহমান বাবুকেই এই ঘটনায় টার্গেট করা হয়েছিল। তবে কী কারণে শুটার ভাড়া করে তাকে হত্যা করতে চেয়েছিল, সে বিষয়টি এখনো জানা যায়নি। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চঞ্চলে বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং সেই মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। 

এদিকে ইউসুফ হত্যায়ও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেছে তার পরিবার। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ নালাম সরদারের (৪৫) গ্রামের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর থানার হুগলাবুনিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম ইয়াসিন সরদার। তিনি পেশায় কাঁচামাল ব্যবসায়ী। তার মাথার পেছনে গুলি লেগেছে।

অন্য গুলিবিদ্ধ মনির হোসেনের (৩২) গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানায়। তার বাবার নাম মালেক শিকদার। তিনি পেশায় ফুটপাতের কাপড় ব্যবসায়ী।

কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, গুলির ঘটনায় কাফরুল থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের হয়েছে। ইউসুফের পরিবার থেকে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বেশ কয়েকজনের নাম রয়েছে। অন্যদিকে চঞ্চলের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আলাদা মামলা হয়েছে।

ঘটনার নেপথ্য কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এর পেছনের মূল কারণ জানা যায়নি। আমাদের কাছে শুধু চঞ্চল গ্রেপ্তার রয়েছে। অন্য আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।

আরটিভি/ এসকেডি