বুধবার, ১৩ এপ্রিল ২০২২ , ০৫:৫৮ পিএম
ঐতিহ্যবাহী কুসুম্বা মসজিদ। অনন্য স্থাপত্যশৈলীর দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটি শুধু নওগাঁয় নয়, বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর অন্যতম। স্থানীয়দের কাছে এটি কালাপাহাড় নামেও পরিচিত। প্রতিনিয়ত দূর-দূরান্ত থেকে প্রচুর পর্যটক আসেন পাঁচ টাকার নোটে অঙ্কিত নওগাঁর ঐতিহ্য কুসুম্বা মসজিদ দেখতে।
স্থানীয়দের মধ্যে কথিত আছে, এক রাতের মধ্যে জিনেরা মসজিদ এবং দিঘি তৈরি করেছিলেন।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে দিঘির পশ্চিম পাড়ে পাথরের তৈরি ধূসর বর্ণের কুসুম্বা মসজিদটি অবস্থিত। প্রবেশমুখে বসানো ফলকে মসজিদের নির্মাণকাল লেখা রয়েছে হিজরি ৯৬৬ সাল (১৫৫৮-১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দ)। সুলতান গিয়াস উদ্দিন বাহাদুর শাহের রাজত্বকালে সুলতান সোলায়মান নামের এক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেন।
১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের তিনটি গম্বুজ নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করে। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মসজিদের চতুর্দিকে ও পূর্বপার্শ্বে অবস্থিত দিঘির পাড়ে ফুলের বাগান নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ করা হয়।
কুসুম্বা শাহী মসজিদের পেশ ইমাম হাজেফ মওলানা মো. ওবাইদুল হক জানান, কালো পাথরে নির্মিত এ মসজিদটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো; যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৮ ফুট ও প্রস্থ প্রায় ৪২ ফুট ৬ ইঞ্চি। দুই সারিতে ৬টি গোলাকার গম্বুজ এবং তিনটি মিহরাব রয়েছে।
ভেতরের অংশে রয়েছে একটি মঞ্চ বা এজলাস, যা আফগান শাসন আমলে বিচার কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো। মসজিদটিতে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের গায়ে রয়েছে মনোরম লতাপাতার নকশা।
তবে এক রাতে মসজিদ এবং দিঘি জিন দ্বারা নির্মিত হওয়ার গল্পকে কুসংস্কার বা রূপকথার গল্প বলে জানান তিনি।
ওবাইদুল হক বলেন, প্রাচীন ঐহিত্যের নিদর্শন হওয়ায় দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীরা মসজিদটিকে দেখতে আসেন।
এ ছাড়া মসজিদে মাঝের প্রবেশপথের ওপর ফলকে আরবি ভাষায় একটি লিপি লেখা রয়েছে। এর পূর্ব প্রান্তে তিনটি ও উত্তর-দক্ষিণে একটি প্রবেশপথ রয়েছে। মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণের স্তম্ভের ওপর একটি উঁচু আসন রয়েছে। ধারণা করা হয়, এ আসনে বসেই তৎকালীন কাজী-বিচারকরা এলাকার বিচারকার্য করতেন। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পশ্চিম দিকের দেয়ালের থেকে আলাদা। পশ্চিম দেয়ালের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ও মাঝের প্রবেশপথ বরাবর দুটো মিহরাব রয়েছে; যা মেঝের সমান্তরাল। উত্তর-পশ্চিম কোণের মিহরাবটি শুধু একটি উঁচু বেদীর ওপর বসানো।
এ ছাড়া মসজিদে নারীদের নামাজ পড়ার আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের সামনে রয়েছে বিশাল আকৃতির দিঘি। দিঘির আয়তন প্রায় ৭৭ বিঘা। এর দৈর্ঘ্য এক হাজার ২৫০ ফুট ও প্রস্থ ৯০০ ফুট। দিঘিটি সুগভীর ও এর জলরাশি স্বচ্ছ। এদিকে মসজিদে যাওয়ার প্রায় ৫০০ ফুট আগে রাস্তার ডানপাশে বাক্স আকৃতির একটি কালো পাথর আছে।
মসজিদটি জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। মসজিদটিকে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দর্শনার্থীরা মসজিদ ও দিঘি দেখার পর বিনোদনের আর তেমন কোনো জায়গা পান না। পার্ক থাকলে এ সমস্যা দূর হতো। পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখার পাশাপাশি বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে দেখার মতো একটি উপভোগীয় স্থান বলে জানান দর্শনার্থীরা।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী কুসুম্বা মসজিদটি দর্শনার্থীদের মাঝে আরও আকর্শনীয় করতে নানা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক খালিদ মেহেদী হাসান।
তিনি জানান, পর্যটকদের জন্য ইতিমধ্যে একটি বিশ্রাম ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সংস্কার এবং দৈনন্দিন পরিমার্জন যথাযথ সময়ে করা হয়ে থাকে। পর্যটকদের কাছে আরও আকর্শনীয় করে তুলতে উপজেলা প্রশাসনকে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।