ইসমাইল হোসন কিরন
বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫ , ০৩:০৩ পিএম
চারদিক ছেয়ে গেছে পাকা ধানের সোনালি রঙ্গে। কেটে কেটে খেতে শুকাতে দিচ্ছেন অনেকে। আবার কেউ বাড়ি নিয়ে মেশিনে মাড়াই দিয়ে ঘরে তুলছেন। অনেকে খেতেই মাড়াই করা ধান বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে নিচ্ছেন ব্যাপারীদের কাছ থেকে। সবাই ব্যস্ত ধান কাটা, মাড়াই ও বেচা বিক্রিতে। এবার আমনে বাম্পার ফলন হওয়ায় মহাখুশি নোয়াখালী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চরাঞ্চল সহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকরা।
নিঝুমদ্বীপ ছেউয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হক। পালকির চরের পাশে দুই একর জমিতে ধান চাষ করেন। খেতে দেখা হয় তার সঙ্গে। আব্দুল হক জানান, তার চাষ করা জমিটি লোনা পাণিতে প্লাবিত হওয়ার আশংকা থেকে দেশী জাতের আমন চাষ করেছেন। এই জাতটি লোনা পানিতে তেমন একটা ক্ষতি হয় না। ইতোমধ্যে ধান কেটে খেতের মধ্যে মেশিনের সাহায্যে মাড়াই করে নিয়েছেন। পরিমাপ করে দেখা গেছে দুই একর জমিতে প্রায় ৮০ মন ধান পেয়েছেন। জমির পাশে রাস্তা না থাকায় বস্তায় মাথায় বহন করে এসব ধান বাড়িতে নিয়ে যাবেন।
একই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পাশে রাস্তার উপর ধান পরিমাপে ব্যস্ত কৃষক নুরুল ইসলাম। দাড়ি পাল্লা দিয়ে নিজের ধান নিজেই পরিমাপ করছেন। স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে সহযোগিতা করছেন। আলাপকালে নুরুল ইসলাম জানান, বনবিভাগের বাগানের পাশে দুই একর জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। এই বছর জোয়ারে তেমন একটা প্লাবিত হয়নি। এছাড়া বৃষ্টি ও সঠিক সময়ে হয়েছে। তাতে আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন। দুই একর জমি চাষে তার খরচ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। তাতে যে পরিমাণ ধান পেয়েছেন ভালো লাভ হবে বলে জানান তিনি।
শুধু নিঝুমদ্বীপ নয় এই দৃশ্য হাতিয়ার ঢালচর, চরগাসিয়া, চর আতাউর ও দমারচরে। এসব চরে দেশী জাতের আমন চাষ হয়েছে। তবে তুলনামূলক এই ধান মৌসুমের প্রথমে চাষ করায় অনেক আগে পাকন ধরেছে। তাতে ধান কাটাও অনেকটা শেষ পর্যায়ে। অন্যদিগে হাতিয়ার মূলভখণ্ডে অর্থাৎ বেড়িবাঁধের ভিতরে চাষ হয়েছে উফসী জাতের আমন। যা এখনো পুরোপুরি পাকন ধরে নি। কিন্তু খেতে ধানের অবস্থা দেখে বুঝা যায় গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতা রেকর্ড করবে এই বছর। বিভিন্ন জাতের ইরি ও উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সরবারহ করা বীজ থেকে চাষ করা আমন মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে।
উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের কালিরচর গ্রাম। অনেক আগ থেকে ধান ও রবিশস্য চাষে এই গ্রামের সুনাম রয়েছে। এই গ্রামের সাগরিয়া বাজার থেকে ইসলামিয়া বাজার যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশে বিশাল বিশাল বিলে পাকা ধানের দৃশ্য সবার মন কাড়বে। এই গ্রামের কৃষক নুর উদ্দিন জানান, গত কয়েক বছর অতি বৃষ্টির কারণে চাষে তেমন একটা সুবিধা করতে পারেন নি। এই বছর খেতের ধান দেখে বুঝা যায় বাম্পার ফলন হবে। তার এক একর জমিতে ইরি ধান চাষ করেছেন। তাতে ৬০-৭০ মন ধান পাবেন বলে আশা করছেন। শুধু বুড়িরচর ইউনিয়নে নয় একই অবস্থা হাতিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে।

হাতিয়ার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ লোকের বসবাস। এর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দ্বীপ উপজেলা হওয়ায় এখানে বেড়ীবাঁধের বাহিরে ও ভেতরে দুধরনের ধান চাষ হয়। বেড়ীবাঁধের বাহিরে নিঝুমদ্বীপ সহ চরাঞ্চলে আমনের দেশীজাত চাষ হয়। আর ভেতরে আমনের উফসী জাত চাষ হয়। এই বছর বর্ষা-মৌসুমে বৃষ্টি ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে আমনে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাযায়, এই বছর হাতিয়াতে ৭৭ হাজার ৭শত ৫০ হেক্টর একর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে দেশি জাতের আমন চাষ হয়েছে ১০ হাজার ৫১০ হেক্টর। উফসী জাতের আমন চাষ হয়েছে ৬৭ হাজার২৪০ হেক্টর জমিতে। তাতে উৎপাদন লক্ষ মাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ সবুজ জানান, এই বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সময় মত কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ায় তেমন কোন সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়নি চাষিদের। এই বছর আমনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
আরটিভি/এএএ