রোববার, ২২ মার্চ ২০২৬ , ০৪:১৫ পিএম
ঈদের দ্বিতীয় দিনে মর্মান্তিক চার দুর্ঘটনা ঘটেছে দেশের ৪ জেলার সড়কে। মাত্র ৬ ঘন্টারও কম সময়ের ব্যবধানে ঝরে গেছে ১৯ প্রাণ।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টা থেকে রোববার (২২ মার্চ) সকাল ৯টার মধ্যে কুমিল্লা, ফেনী, বান্দরবানে ও হবিগঞ্জে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লায়। নগরীর পদুয়া বাজার রেল ক্রসিং অতিক্রম করতে গিয়ে ঢাকামুখী একটি ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে মুচড়ে গেছে যাত্রীবাহী একটি বাস। রাত ৩টার দিকে ঘটা এই দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও তিনজন শিশু।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ওয়ান আপ ট্রেন কুমিল্লা নগরীর পদুয়ার বাজার রেল ক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে রেললাইনের ওপরে থাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। ওই সময় বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেন।
কুমিল্লায় মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার মাত্র ৪৫ মিনিটের ব্যবধানে আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে ফেনীতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল অংশে ভয়াবহ এক ত্রিমুখী সংঘর্ষ ঘটেছে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের মধ্যে। রোববার ভোর পৌনে ৪টার দিকে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেইসঙ্গে আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন।
মহিপাল হাইওয়ে থানা পুলিশের ইনচার্জ আসাদুল ইসলাম জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি লেনের কাজ চলছিল। ওই সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীর গতিতে পার হচ্ছিল। এই অবস্থায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। বিষয়টি নিয়ে বাস-অ্যাম্বুলেন্স চালকের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে পেছনে মোটরসাইকেলসহ আরও কিছু বাসের জট লেগে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই পেছন থেকে বেপরোয়া গতিতে আসা দোয়েল পরিবহনের একটি বাস জটলার মধ্যে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হলে এক মোটরসাইকেল আরোহী ছাড়াও বাসের সুপারভাইজার ও এক যাত্রী নিহত হন। হতাহতদের নাম-পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে।
ফেনী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহাদাৎ হোসেন জানিয়েছেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে দুর্ঘটনাকবলিত বাসকে সরিয়ে আহতদের উদ্ধার করে ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনার এক ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে বান্দরবানের পাহাড়ি রাস্তায় বাঁক নিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেছে পর্যটকবাহী একটি বাস। রোববার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর না পাওয়া গেলেও আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এর মধ্যে ৫ জন এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন আছেন আইসিইউতে।
বান্দরবান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মান্না দে জানিয়েছেন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আহতদের উদ্ধার করে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাসটিতে থাকা ৪৩ জন যাত্রী গতরাতে ঢাকা থেকে বান্দরবানে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। পাহাড়ের ঢালু ও আঁকাবাঁকা রাস্তায় চালক নিয়ন্ত্রণ হারানোয় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বান্দরবান সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহত ২০ জনের মধ্যে কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলেও ৫ জনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পর্যটন মৌসুম হওয়ায় বান্দরবানমুখী রাস্তায় যানবাহনের চাপ বেড়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় অনভিজ্ঞ চালক বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এমন দুর্ঘটনা কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এসব ঘটনার মাত্র ৫-৬ ঘণ্টার ব্যবধানে আরও একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায় হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে। রোববার সকাল আনুমানিক ৮টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে নারী ও কিশোরসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে মাধবপুর থানা পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতায় পিকআপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের গভীর খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই চারজন আরোহীর মৃত্যু হয়।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল রানা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সকালে কুয়াশা বা অতিরিক্ত গতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। স্থানীয়রা বিকট শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করেন এবং পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এসে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। পিকআপটি খাদে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যাওয়ায় ভেতর থেকে মরদেহ বের করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
পুলিশ সূত্রমতে, ঘাতক বাসটি দ্রুতগতিতে ওভারটেক করার চেষ্টা করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপটিকে ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনার পরপরই বাসের চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়। তবে পুলিশ বাসটিকে জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
দুর্ঘটনার পর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর অংশে কিছু সময়ের জন্য যান চলাচল বিঘ্নিত হলেও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়।
আরটিভি/এআর