images

দেশজুড়ে

কুমিরে টেনে নিয়ে যাওয়া কুকুরের মাথা পাঠানো হলো ঢাকা সিডিআইএলে

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ০৭:৩১ পিএম

বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলীর (রহ) মাজার সংলগ্ন দীঘিতে থাকা একমাত্র মাদি কুমির একটি কুকুরকে শিকার করেছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার পর কুকুরটির মাথা ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়।  

বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে মাজারের টাইলস বাঁধানো সিঁড়িঘাট থেকে কুকুরটিকে নিয়ে যায় কুমির। পরে কুমিরের কুকুর শিকারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করেছেন কুকুরটিকে হাত-পা বেঁধে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়েছে।

আবার কেউ বলছেন, মাজারের খাদেমরা কুমিরকে কুকুর খাওয়ায়। বিশেষ করে ফেসবুকে এসব নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

মাজারের খাদেম, নিরাপত্তাপ্রহরী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ঘটনার দিন মাজারের দিঘির কাছে একটি অসুস্থ কুকুর শিশুসহ কয়েকজনকে কামড় দেয়। কয়েকজন তখন কুকুরটিকে তাড়াতে লাঠি ছুড়ে মারে। কুকুরটি নারীদের ঘাট থেকে তখন মূল ঘাটের দিকে দৌড় দেয়। সেখানে গিয়ে মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী ফোরকানকে আঁচড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি পানিতে পড়ে যায়। এরপর কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর কুকুরটি মৃত অবস্থায় দিঘির অন্য পাশে ভেসে ওঠে। পরে সেটিকে উদ্ধার করে মাটিচাপা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন
DOG

দিঘির ঘাটে কুমিরের মুখে কুকুর, ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা জানা গেল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৫৬ সেকেন্ডের ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও এবং পরবর্তীতে নেটিজেনদের বিভিন্ন মন্তব্য ও যে যার মতো ফেসবুকে ফলোয়ার বাড়াতে চলে নানামুখী প্রতিযোগিতাও।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য শেখ মোহাম্মাদ নূর আলম বলেন, মাজারে কুমিরে যে কুকুরটিকে নিয়েছে বিষয়টি খুব হৃদয়বিদারক। দুর্ঘটনা না হয়ে যদি কেউ আনন্দ পাওয়ার জন্য বা ভিউ বাণিজ্যের জন্য কুকুরটিকে ধরে কুমিরের মুখে দিয়ে থাকে তাহলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এই পরিবেশকর্মী।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অন্যান্য দিনের মতো বুধবার বিকেলেও মাজার সলগ্ন ঠাকুরদীঘির প্রধান ঘাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় ছিল। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মাজারের খাদেমদের নিয়োগকৃত নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকান হাওলাদার। হঠাৎ করে নারীদের ঘাটের দিক থেকে আক্রান্ত কুকুরটি দৌড়ে আসে এবং প্রধান ঘাটে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকানের পায়ে কামড় দেয়। ফোরকান পা ঝাঁকি দিলে দর্শনার্থীদেরও কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে কুকুরটি।

নিরাপত্তা প্রহরী কুকুরটিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে কুকুরটি ঘাটের টাইলস বাঁধানো নিচের সিঁড়ির দিকে নামার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দীঘির ঘাটে থাকা একমাত্র কুমিরটি এসে কুকুরটিকে পানির নিচে নিয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে কুকুরটির মরদেহ পাওয়া যায় এবং মাজারের খাদেমরা কুকুরটিকে মাটিচাপা দেয়।

এদিকে কুকুরের মৃত্যুর ঘটনায় বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কমিটি শনিবার বিকালে মাজার এলাকায় কুকুরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে।

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধায়নে এ ময়নাতদন্ত হয়। পরে কুকুরটির মাথা ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়।

তদন্ত কমিটির প্রধান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুন জানান, সেখান থেকে রিপোর্ট এলে কুকুরটি অসুস্থ বা জলাতঙ্কগ্রস্ত  ছিল কিনা তা জানা যাবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী বলেন, কুকুরটি মাথার স্যাম্পল ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পারীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে রিপোর্ট পেলে কুকুরটি অসুস্থ ছিল কি না বা জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ছিল কি না—বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাবে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, মাজারের দীঘিতে কুমিরকে কখনই কুকুর খেতে দেওয়া হয় না। আমার জানা মতে, এটা ভিত্তিহীন। তবে অনেক সময় ভক্তরা চান তাদের মুরগিটা কুমিরের জন্য ছুড়ে দিতে। ছুড়ে দিলে ওই মুরগিটা আবার পাড়ে চলে আসে। এ ধরনের জীবিত প্রাণী ছুড়ে দেওয়া কুসংস্কার; এগুলো বন্ধ করা দরকার।

তিনি বলেন, খাদেমসহ যারা মাজারের দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন তাদের নির্দেশনা দিয়েছি, কুমিরের খাবার হিসেবে যেন কোনো জীবন্ত প্রাণী দীঘিতে না ফেলা হয় এবং এ বিষয়ে যেন তারা সতর্ক থাকেন।

তিনি আরও বলেন, প্রাণীটির শরীরে কুমিরের আঘাত ছাড়া আর কোনো আঘাত আছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি সবার সঙ্গে কথা বলবে এবং প্রাথমিকভাবে যা পাবে তার ওপর ভিত্তি করে দ্রুতই একটি প্রতিবেদন দিয়ে দেবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য ছড়ানোর আগে অবশ্যই সেটিকে যাচাই-বাছাই করা উচিত। 

তিনি এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হবার আহ্বান জানান।

আরটিভি/এমএ