রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ , ০৪:৪৮ পিএম
পিরোজপুর সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে মঠবাড়িয়ায় সাপলেজা ইউনিয়নে বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত কুঠিবাড়ি প্রাসাদ। প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আঠারো শতকের গোড়ায় জনৈক ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এ কুঠিবাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। সোয়া ৯ একর জমির ওপর নির্মিত হয় এই কুঠিবাড়ি। কথিত আছে, ক্যাসপার ঘটনাক্রমে সাপলেজা ভ্রমণকালে স্থানীয় ধনাঢ্য ফরাজউল্লাহ তাকে সম্মানিত করতে ওই জমি উপহার দেন। পরবর্তীকালে এখানে ক্যাসপারের জমিদারি সম্প্রসারিত হয়।
প্যারি ক্যাসপারের উপস্থিতিতে প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষভাগে কুঠিবাড়িতে পুণ্যাহ উৎসব উপলক্ষে খাজনা আদায়সহ প্রজাদের মনোরঞ্জনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর মধ্যে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রা ও নিমাই সন্ন্যাসী পালায় প্রচুর লোকসমাগম হতো। কুঠিবাড়ির মূল ভবন নির্মাণে প্রচলিত ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর দোতলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত ছিল। এ ছাড়া ছিল অন্যান্য স্থাপনা ও বড় একটি পুকুর। কুঠিবাড়ির ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত মূল্যবান সামগ্রী ও তৈজসপত্র ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ব্রিটিশরা চলে গেলে ভবন ও সম্পত্তি তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অজ্ঞাত কারণে ভেঙে দেওয়া হয় মূল ভবনটির দোতলার সম্পূর্ণ অংশ। তখন এ অংশে রক্ষিত মূল্যবান মালপত্র বেহাত হয়ে যায়। সুন্দরবনসংলগ্ন সাপলেজা ইউনিয়নের কুঠিবাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।
লিখিত আকারে এই ভবনের বিস্তারিত ইতিহাস না পাওয়ায় এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার ও তার জমিদারি, ব্যক্তিগত জীবন, ভবনের নির্মাণশৈলী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ক্যাসপারের ব্যবহৃত যে দুটি তরবারিসহ কিছু তৈজসপত্র ছিল, তাও এখন নিখোঁজ। বর্তমানে কুঠিবাড়িটি ২০০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শানবাঁধানো ঘাটসহ পুকুরটি জৌলুসহীন। কুঠিয়াল ক্যাসপার এখানে কখনও বসবাস না করে তার অতি বিশ্বস্ত কর্মচারী সুরেশ চন্দ্র সুর ও সতীশ চন্দ্রের মাধ্যমে জমিদারি পরিচালনা করতেন বলে জানা যায়। ফসল তোলা শেষ হলে জমিদার ক্যাসপার নির্দিষ্ট দিনে খাজনা সংগ্রহ করে চলে যেতেন।
এক সময় প্রতি বছর পৌষ মাসের শেষভাগে কুঠিবাড়িতে পুণ্যাহ উৎসব উপলক্ষে খাজনা আদায়সহ প্রজাদের মনোরঞ্জনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর মধ্যে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রা ও নিমাই সন্ন্যাসী পালায় প্রচুর লোকসমাগম হতো।
সতীশ চন্দ্রের কোনো বংশধরের খোঁজ পাওয়া যায় না। প্রথমে ক্যাসপার সাহেবের মূল বাড়ি সংস্কার ও পরিবর্তন করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস (তহশিল অফিস) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই জমিতে অন্য স্থানে নতুন ভূমি অফিস ভবন নির্মিত হওয়ায় ক্যাসপারের বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত। ক্যাসপার সাহেব চলে যাওয়ার আগে সাপলেজা এলাকার গ্রামের নাম তার বাবা শিলার সাহেবের নামে নামকরণ করে যান। স্থানীয় ডাকঘরটি ক্যাসপারের বাবা শিলার সাহেবের নামে এখনও শিলারগঞ্জ নামে পরিচিত। নায়েব, পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল আরও একটি ভবন। দ্বিতল ভবনটির নিচতলায় অফিস কক্ষে বসে এলাকার খাজনা আদায় ও বিচার পরিচালনা করা হতো। এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপারের একটি বড় নৌকা ছিল। এ নৌকায় করেই তিনি শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ (বর্তমান বরিশাল) থেকে কুঠিবাড়িতে আসতেন। এলাকার খাজনা আদায় করে আবার শীত শেষে চলে যেতেন। যেহেতু তিনি শীত মৌসুমে এখানে অবস্থান করতেন, তাই ভবনটিকে গরম রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল ভবনের নিচে চার কোণে কয়লার আগুন রাখার ব্যবস্থা ছিল। এতে পুরো বাড়ি গরম থাকত।
স্থানীয়রা জানান, সরকার কুঠিবাড়ির মালিকানা নিলেও এর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ভালো উদ্যোগ নেয়নি। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রত্নসম্পদ সাপলেজা কুঠিবাড়ি। বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবন জরুরি সংস্কার করা না হলে মূল ভবনটিসহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (প্রকাশনা) মো. গোলাম ফেরদৌস জানান, এটি সংরক্ষণের জন্য একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এখনো গেজেট হয়েছে কি না, সেটি তিনি নিশ্চিত নন। তবে সংরক্ষণের জন্য ইতিবাচক প্রস্তাব দেওয়া আছে।
আরটিভি/টিআর