সোমবার, ০৪ মে ২০২৬ , ০২:১৮ পিএম
নওগাঁ মান্দায় ভারশোঁ ইউনিয়নের লক্ষ্মীর মোড়ে ব্যস্ততম সড়কের দুই পাশে বসেই প্রতিদিন জমে ওঠে দুধের হাট। নেই কোনো স্থায়ী অবকাঠামো, নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। তবুও দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলছে এই বেচাকেনা। অথচ মাত্র ৩০ মিনিটেই এখানে হাতবদল হয় লাখ টাকার দুধ।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। হঠাৎ করেই ব্যস্ততম এই মোড় সংলগ্ন সড়কের দুই পাশে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। সাইকেল, ভ্যান কিংবা হাতে করে বড় বড় জরকিন, বোতল ও বলতি নিয়ে হাজির হন স্থানীয় খামারিরা। চারপাশ থেকে ছুটে আসেন পাইকাররা। শুরু হয় দ্রুত দরদাম। ঠিক ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর, ঘড়িতে যখন ২টা বাজল পুরো এলাকা এক নিমেষেই ফাঁকা! নেই কোনো দুধের পাত্র, নেই কোনো বিক্রেতা। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকার দুধ বিক্রি হয়ে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ মণ দুধ আসে এখানে। তবে এই বাজার ঘিরে রয়েছে হতাশা ও ঝুঁকি।
জোতবাজার থেকে আসা দুধ বিক্রেতা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, আজকের দিনে দুধের বাজার লিটার প্রতি ৪০ টাকা হিসেবে স্থিতিশীল রয়েছে এবং বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মণ দুধের আমদানি হচ্ছে।
বাজারের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, এই দুধের হাটটি একটি অত্যন্ত ব্যস্ত রাস্তার দুই পাশে বসে। যেখানে সারাদিনই ধান ও মালবোঝাই ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। এই ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে সেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গত বছর আমার বাবা দুধ নিয়ে এই হাটে আসার সময় রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন। এরপর থেকে আমার বাবা আর এই বাজারে আসেন না। দুধ বেচাকেনার জন্য ক্রেতা-বিক্রেতাদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
মহানগর থেকে আসা আরেক দুধ বিক্রেতা মোজাম্মেল হক বলেন, এখানে প্রতিদিন দুপুর ১টা ৪০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ২টা পর্যন্ত বেশ ভালো বেচাবিক্রি চলে। এই সময়ের মধ্যে মোটামুটি ১ থেকে দেড় লাখ টাকার দুধ কেনবেচা হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এখানে দুধ কিনতে আসেন এবং আমরাও তাদের কাছে দুধ বিক্রি করি। সাধারণত ৩০ মিনিটের মধ্যেই পুরো বাজারের বেচাকেনা শেষ হয়ে যায়।
পাইকারি ক্রেতা পরিতোষ কুমার বলেন, আমি এই বাজারে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন নিয়মিত দুধ কেনাবেচা করছি। এখান থেকে গড়ে ৭ থেকে ৮ মণ এবং মাঝে মধ্যে ১০ মণ পর্যন্ত দুধ কিনি। এই সংগৃহীত দুধ থেকে পরবর্তীতে ছানা তৈরি করে থাকি। তবে রাস্তার দুই পাশে হাট বসার কারণে ও রাস্তাটি অত্যন্ত ব্যস্ত হওয়ায় সেখানে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং আমরা খুব ভয়ে থাকি।
বাজারের সভাপতি মো. ফজলুর রহমান বলেন, এটি একটি অত্যন্ত পুরনো এবং বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও এর নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। মেইন রোডের দুই পাশে হাট বসার কারণে এবং রাস্তাটি অত্যন্ত ব্যস্ত হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। ইতোপূর্বে এখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিন জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, হাটের পাশেই সরকারি জায়গা রয়েছে যা বর্তমানে অবৈধ দখলে। প্রশাসনের কাছে আমার দাবি যেন সেই জায়গাটি উদ্ধার করে দুধের হাটের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতারা জীবনের ঝুঁকি ছাড়া নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবেন এবং বাজারের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
এ বিষয়ে ভারশোঁ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, প্রতিদিন এই বাজারে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার দুধ কেনাবেচা হয়। মহাসড়কের ধারে হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রবল। আমরা ইতোমধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে রেজুলেশন করেছি। দ্রুতই ইউএনও বরাবর জায়গা বরাদ্দের আবেদন জানানো হবে। জায়গা পেলে শেড ও মাটি ভরাট করে বাজারটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএইচজে