images

দেশজুড়ে

হাজিরা খাতায় শিক্ষিকার স্বাক্ষর, ক্লাস নিচ্ছে দাখিল পাস ছেলে

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ , ১০:১৮ পিএম

সকাল গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ১০টা। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের  ১৫২ নম্বর দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে চলছে পাঠদান। শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠ বুঝিয়ে দিচ্ছে এক কিশোর। দৃশ্যপট স্বাভাবিক মনে হলেও একটু খোঁজ নিতেই বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর তথ্য— সে বিদ্যালয়ের কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক নয়, বরং ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের ছেলে মিরাজুন্নবী সিয়াম। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেও একজন শিক্ষার্থী। স্থানীয় একটি মাদরাসা থেকে সদ্য দাখিল পাস করা এই তরুণ বর্তমানে ঢাকার দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদরাসায় আলিম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। অথচ নিজের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছে সে।

কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। তারা জানান, গত কয়েক মাস ধরেই মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার পরিবর্তে তার ছেলেকে পাঠদান করতে দেখা যাচ্ছে। অভিভাবকদের প্রশ্ন, একজন সদ্য দাখিল পাস করা শিক্ষার্থী কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করে?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম অসুস্থতাজনিত কারণে দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চিকিৎসাজনিত কারণে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বিশ্রামে ছিলেন। তবে এই সময়ে তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী ছুটি নিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। সেই সময়েও তার ছেলেকে দিয়ে পাঠদান করিয়েছেন বলে স্বীকার করেছে মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেই। সম্প্রতি ওই শিক্ষিকার পরিবর্তে সিয়ামের পাঠদানের দিনগুলোতে হাজিরা খাতায় ঠিকই ওই শিক্ষিকার স্বাক্ষর ছিল। শ্রেণিপাঠদান না করলেও প্রতিদিনই স্কুলে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফাতেমা বেগমের সহকর্মীরা। প্রশ্ন উঠেছে— যদি তিনি সত্যিই অসুস্থতার কারণে শ্রেণিপাঠদান করাতে না পারেন, তবে কীভাবে তিনি স্বাক্ষর করার জন্য স্কুলে আসেন? শারীরিক অসুস্থতার কারণে পাঠদানে অক্ষম হলে কেন তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবগত করে ছুটি নেননি?

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় থেকেই দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চালিয়ে আসছেন ওই শিক্ষিকা। কেউ কেউ বলেন, শিক্ষিকার এক প্রভাবশালী আত্মীয় আইনজীবী থাকায় প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের জায়গায় সদ্য দাখিল পাস করা ছেলে যদি ক্লাস নেয়, তাহলে শিশুদের শিক্ষার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে?

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক ছাড়া অন্য কারও পাঠদান করা শিক্ষা নীতিমালা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ ঘটনায় সচেতন অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

কথা হয় অভিযুক্ত শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার অসুস্থতার কারণে ছেলে ক্লাস নিচ্ছে।

তার ছেলের ক্লাস করানো যথার্থ হচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের বিপরীতে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। যদি অসুস্থই হয়ে থাকেন, তবে কেন ছুটি নেননি— এ প্রশ্নের বিপরীতেও তিনি নীরব ছিলেন। ফের প্রশ্ন করা হয়— আপনি স্কুলে গিয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন অথচ আপনার ছেলে অপরিপক্বভাবে পাঠদান করছে, এটি নিয়মবহির্ভূত এবং স্পষ্ট প্রতারণা কি না? এমন প্রশ্নে তিনি প্রতারণার কথা স্বীকার করে বলেন, আমার ভুল হয়ে গেছে।

পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস শেষ করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হলে মিরাজুন্নবী সিয়ামকে জিজ্ঞেস করা হয়, সে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিপাঠদান করাতে পারে কি না। জবাবে সে বলে, মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও মায়ের অসুস্থতার সময় প্রায় দেড়-দুই মাস আমি ক্লাস করিয়েছি। এখন আবার অসুস্থ, তাই এখন ক্লাস করাচ্ছি।

শনিবার (৯ মে) দুপুরে মিরাজুন্নবী সিয়ামকে দিয়ে শ্রেণিপাঠদানের বিষয়ে জানতে দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারের কাছে যাওয়া হলে, সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি তড়িঘড়ি করে মুঠোফোনে কাউকে কল দেন। এরপর কথা বলা শেষ হলে, মিরাজুন্নবী সিয়ামকে ক্লাস করার অনুমতি তিনি দিতে পারেন কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। নিউজের পর কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

বন বিভাগের গাছ কাটার অভিযোগ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (৭ মে ) সকাল ১১টায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন সুলতানার অফিসে গিয়ে তাকে না পাওয়ায় মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, আমি একটা প্রোগ্রামে এসেছি। শিক্ষিকার পরিবর্তে ছেলে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি গতকাল জেনেছি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন মুঠোফোনে বলেন, আমি আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। অবিলম্বে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, আমি চাঁদপুর জেলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব, যেন তিনি এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

আরটিভি/এমএইচজে