রোববার, ১০ মে ২০২৬ , ০৮:৩৯ পিএম
হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে সুনামগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকসহ মোট ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে।
রোববার (১০ মে) সুনামগঞ্জ শহরের পূর্ব তেঘরিয়ার মো. জহুর মিয়ার ছেলে মো. মোছাদ্দেক আলী সরকারি ডাকযোগে এ অভিযোগ দুদকের সিলেট কার্যালয়ে পাঠান।
দুদকের সিলেট জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালকের বরাবরে এ অভিযোগ পাঠানো হয়। দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। দুদকে পাঠানো অভিযোগের কপি সুনামগঞ্জের বিভিন্নজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি, সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ না করাসহ নানা অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের নামে অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে সুনামগঞ্জে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসলি জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।
অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধের কারণে কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ দুর্নীতিতে জড়িতদের ব্যক্তিগত তহবিল এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের দাবি জানানো হয়। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার, নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক, দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সার্ভেয়ার (প্রকৌশল) তানভীর আহমেদ সিদ্দীকি, হিসাব করণিক শ্রীবাস চন্দ্র সরকার, সহকারী হিসাবরক্ষক মো. বদরুল আলম, হিসাব করণিক হালন আহমেদ, ঊর্ধ্বতন হিসাব সহকারী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, কার্যসহকারী মো. এমদাদুল হক, সার্ভেয়ার (প্রকৌশল) মো. সোহানুর রহমান, কার্যসহকারী সুদীপ্ত শেখর দাস, কার্যসহকারী জিতেন অধিকারী, ট্রেসার মো. জাহিদ হাসান, কার্যসহকারী টিটু কুমার পাল, ঊর্ধ্বতন হিসাব সহকারী প্রবাল চন্দ্র তালুকদার, কার্যসহকারী মো. ফজলুল হক, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. নাহিদ পারভেজ শুভ, ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রভাংশু সরকার, ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট রবীন্দ্র চন্দ্র দাস, ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট অনন্ত কুমার দাস এবং অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মো. আল শফিকুল আলম।
এ ছাড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ নাজমুল কবির, অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) মো. ফারুক আহাম্মেদ, অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) সাজ্জাদ হোসেন মজুমদার, কৃষি প্রকৌশলী তাপস কুমার তালুকদার, জেলা অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নবী হোসেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রত্ন ভট্টাচার্য, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদৎ হোসেন, এ অফিসের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূরুল আমিন, শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আহসান হাবিব, শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নজিবুল্লাহ আকন্দ, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাহুল তালুকদার, আতাউর রহমান, মোহাম্মদ সামছুল আলম, মো. দিদারুল আলম, ডয়রিন পুরকায়স্থ, মোক্তার হুসাইন, জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ, উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা তপন চন্দ্র শীল, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফজলুল হক, মো. রেজাউল করিম, আমীর আফজাল, অঞ্জন রায়, সুমন চন্দ্র দাস, বুলবুল জাহান কমল, সুজন সরকার ও রুবেল মিয়া।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সুনামগঞ্জের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে অসময়ে ধান তলিয়ে যাওয়া এবং কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের (২৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে কাজ শেষ না হওয়া, নিম্নমানের কাজ এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ও পাউবো কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে দুর্নীতি হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ থাকলেও অনেক প্রকল্পে ৩০ শতাংশ কাজও সম্পন্ন হয়নি, যার কারণে ফসল তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় অপরিকল্পিত ও দুর্বল বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে, যা পাহাড়ি ঢলের চাপ সহ্য করতে পারেনি। কাজ না করে বা কম কাজ করে পিআইসির মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অনেক স্থানে যেখানে প্রকল্পের প্রয়োজন নেই, সেখানেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত কৃষক বা ভূমিমালিকের পরিবর্তে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবে পিআইসি গঠন করা হয়েছে।
এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। কাজ শেষ করার সময়সীমা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও ওই সময়ের মধ্যে অনেক কাজ শেষ হয়নি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
গত ১৫ ডিসেম্বর জেলার ১২টি উপজেলায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলেও বর্ধিত সময় দেওয়ার পরও অধিকাংশ এলাকায় কাজ যথাযথভাবে শেষ হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অগ্রগতির তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতারও মিল পাওয়া যায়নি এবং এসব কাজে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
অনেক স্থানে অক্ষত বাঁধ প্রকল্পেও অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়। পাশাপাশি বেশ কিছু ক্লোজার ও বাঁধ নির্মাণে বালু ও কাঁদাযুক্ত মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরোনো বাঁধের মাটি মেশিন দিয়ে তুলে আবার ব্যবহার করে কাজ শেষ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জেলার হাওর রক্ষা বাঁধের অন্তত ১১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। হাওরের কান্দা ও ফসলি জমির ওপরের মাটি কেটে নেওয়ায় আবাদি জমির পরিমাণ ও উর্বরতা কমছে এবং গোচারণভূমিও হুমকির মুখে পড়ছে।
বাঁধের কাজে শুরু থেকেই এক ধরনের খামখেয়ালিপনা দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে গণশুনানি করে প্রকল্প নির্ধারণ ও পিআইসি গঠনের দাবি থাকলেও সেটি করা হয়নি। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবে পিআইসি গঠন করা হয়েছে। এতে প্রশাসন ও পাউবো কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক ও সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা ফোন রিসিভ করেননি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মো. ইমদাদুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এমন একটি অভিযোগের কপি আমাদের নজরে পড়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় বা কোনো কাজ নিয়ে অভিযোগ নেই। তিনি অফিসের সবার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। আমাদের ধারণা, হয়রানির জন্য এই অভিযোগ করা হয়েছে। কারণ বাঁধের কাজের সঙ্গে কমিটির সদস্য থাকা ছাড়া কৃষি বিভাগের বিশেষ কোনো কাজ নেই। কিন্তু অভিযোগে কৃষি বিভাগের অনেক কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে স্মরণকালের হাওরডুবির পর দুদকের পক্ষ থেকে একটি এবং জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলাই এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
আরটিভি/টিআর