images

দেশজুড়ে

চোখ ভেদ করে মস্তিষ্কে ঢুকেছে গুলি, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শিশু রেশমি

মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ , ০১:৪৪ পিএম

কয়েক দিন আগেও যে শিশু বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যেত, ঘরের কোণে খেলাধুলা করত, সে এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামীর রউফাবাদ কলোনির শিশু রেশমীর বাড়িতে এখন শুধুই কান্না আর উৎকণ্ঠা। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতিহিংসার বলি হয়ে ১১ বছরের এই শিশুটি এখন লাইফ সাপোর্টে।

গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাত সাড়ে নয়টার দিকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার রউফাবাদ কলোনির শহীদ মিনার গলিতে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এ সময় একটি গুলি লাগে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেশমী আক্তারের বাঁ চোখে। গুলিটি চোখ ভেদ করে তার মস্তিষ্কে ঢুকে যায়। বর্তমানে শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

রোববার (১০ মে) বিকেলে চমেক হাসপাতালের আইসিইউর সামনে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। একদিকে চিকিৎসা চলছে রেশমীর, অন্যদিকে স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে চারপাশ। মা সাবেরা বেগম বারবার চোখ মুছছিলেন, আর বাবা রিয়াজ আহমেদ নিশ্চুপ বসে ছিলেন। রিয়াজ-সাবেরা দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে রেশমী সবার ছোট। প্রয়োজন ছাড়া সে খুব একটা বাইরে যেত না।

কান্নায় ভেঙে পড়ে মা সাবেরা বেগম বলেন, ২০ টাকা হাতে দিয়ে মেয়েকে পান আনতে পাঠিয়েছিলাম। যদি জানতাম বাইরে এমন গোলাগুলি হবে, তবে কখনোই তাকে পাঠাতাম না।

স্বজনরা জানান, ঘটনার সময় এলাকায় প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ চলছিল। আশপাশের লোকজন সরে যেতে পারলেও রেশমী নিজেকে আড়াল করতে পারেনি।

রেশমীর বাবা মো. রিয়াজ আহমেদ একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। হাঁটাচলায় কষ্ট হলেও শাকসবজি বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে তিনি এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পাওয়া গেলেও আইসিইউর খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। রেশমীর বড় ভাই মোহাম্মদ এজাজ জানান, চিকিৎসকেরা তাদের বলেছেন রেশমীর বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম। 

চমেক এনেসথেসিওলজী বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বাকী বিল্লা রোববার একটি গণমধ্যমকে বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ রেশমি আক্তার হাসপাতালের আইসিইউতে লাইফ-সাপোর্টে আছে। তার শারীরিক অবস্থা আজকে আরও খারাপের (অবনতি) দিকে। তার মাল্টি অর্গান ফেইলর। হার্ট, ফুসফুস সবকিছু মেশিন ও ওষুধের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছে। যে কোনো সময় ক্লিনিক্যালি ডেথ ঘোষণা করা হতে পারে।

চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাইফুল আলম জানান, গুলিটি রেশমীর মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে আটকে আছে। এই অবস্থায় অস্ত্রোপচার করলে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণের ঝুঁকি রয়েছে, যা মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শনিবার সকালে গঠিত উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ডও এখনই গুলি বের না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল রাউজানে নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার জেরে এই সংঘাতের সূত্রপাত। সেই হত্যার বদলা নিতেই সন্ত্রাসীরা রউফাবাদ এলাকায় রাজু নামের এক যুবককে টার্গেট করে গুলি চালায়। সন্ত্রাসীদের সেই গুলিতেই বিদ্ধ হয় নিরীহ শিশু রেশমী। এই ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় অজ্ঞাতনামা আট থেকে নয়জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তবে এখনো অধরা রয়ে গেছে মূল অপরাধীরা।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কী কারণে রাজুকে হত্যা করা হয়েছে বা কারা এই মাস্কধারী সন্ত্রাসী, সে বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেনি পুলিশ।

আরটিভি/এআর