সোমবার, ১৮ মে ২০২৬ , ০৮:০৪ পিএম
দেশে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ঘন ঘন আঘাত হানছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি। বিপরীতে এসব দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে প্রয়োজন আধুনিক ও কার্যকর উদ্যোগ। তবে বাংলাদেশ সরকারের একার পক্ষে এই ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠিন। এমন পরিস্থিতি আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন একটি উদ্যোগ।
দেশের উপকূল, হাওরাঞ্চল এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মানবিক সহায়তা সংস্থার অর্থায়নে শুরু হয়েছে ‘প্রতিষ্ঠা (PROTISTHAA)’ নামে একটি প্রকল্প। এটি মূলত ‘দুর্যোগ পরবর্তী সাড়াদান ব্যবস্থাপনা’ থেকে ‘আগাম ব্যবস্থাপনা’ কর্মসূচি।
সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ বি এম সফিকুল হায়দার।
তিনি বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত ও অংশীদারিত্বভিত্তিক প্রক্রিয়া। এ ধরনের উদ্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যে কোনো দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ও সেটি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ক্ষয়ক্ষতি নাটকীয় মাত্রায় কমিয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মোমেনুল ইসলাম বলেন, আমরা পাঁচ দিন পর্যন্ত যে পূর্বাভাস দিয়ে থাকি, তা প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। তবে সময় যত বাড়ে, পূর্বাভাসে ত্রুটির সম্ভাবনাও বাড়ে। আমরা সতর্কবার্তাও দিই, কিন্তু সেই বার্তা প্রয়োজনীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারি না। ফলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কাঙ্খিতভাবে কমিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগেই ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই বন্যার পানি চলে আসে। পরে কিছু অংশের ফসল রক্ষা করা সম্ভব হলেও বড় অংশের ধান রক্ষা করা যায়নি। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার ৭২০ কোটি টাকা।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এসএম রেজাউল করিম বলেন, এই ধরনের আগাম বার্তা শুধু কৃষির জন্য নয়, প্রাণিসম্পদ ও মাছ চাষের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো আমরা এমন কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ দ্রুত এই তথ্য পাবে।
‘প্রতিষ্ঠা’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সংস্থা ‘কেয়ার বাংলাদেশ’ এর প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ফুয়াদ উর রব্বি প্রকল্পের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি জানান, পূর্বাভাস থেকে কার্যকর পদক্ষেপ’ পদ্ধতির মাধ্যমে পূর্বাভাসভিত্তিক তথ্যকে সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করা হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা এবং বিভিন্ন খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি মূলত নদীবিধৌত বন্যাপ্রবণ এলাকা, হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। মৌসুমি বন্যা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সৃষ্ট বহুমাত্রিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম গ্রহণই হবে এর প্রধান লক্ষ্য।
প্রকল্পটির আওতায় ৮৭ হাজারের বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি লিঙ্গ সমতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা- এর মাধ্যমে আগাম সতর্কবার্তার বিস্তৃত প্রচার এবং স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ বিষয়ে কেয়ার বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর (প্রোগ্রামস) এমেবেট মেনা বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাবে কেয়ার।
অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান, ‘ইকো বাংলাদেশ’ এর প্রোগ্রাম অফিসার মোকিত বিল্লাহ ছাড়াও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, মানবিক সংস্থা, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আরটিভি/এমএইচজে