images

দেশজুড়ে / অর্থনীতি

হাওরের শত বছরের ঐতিহ্য চ্যাপা শুঁটকি, রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ০৯:৩০ পিএম

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম চ্যাপা শুঁটকি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই সুস্বাদু খাবার শুধু স্থানীয় মানুষের খাদ্যতালিকায় নয়, এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সমাদৃত। শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই চ্যাপা শুঁটকি কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

হাওরবেষ্টিত নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইনসহ বিভিন্ন উপজেলার খাল-বিল ও নদী থেকে ধরা তাজা পুঁটি মাছ দিয়ে মূলত চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করা হয়। প্রথমে মাছ রোদে শুকিয়ে সাধারণ শুঁটকি বানানো হয়। পরে সেগুলো পরিষ্কার করে মাটির মটকা বা বিশেষ পাত্রে শক্তভাবে ভরে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস সংরক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ সময়ের এই প্রক্রিয়ার পর তৈরি হয় সুগন্ধি ও সুস্বাদু চ্যাপা শুঁটকি।

স্থানীয়দের কাছে চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া শুঁটকি ভুনা, বিভিন্ন সবজির সঙ্গে রান্না, কুমড়া পাতার বড়া এবং চ্যাপা শুঁটকির পিঠাও বেশ সমাদৃত খাবার।

সম্প্রতি ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শুঁটকি তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। বাজার থেকে সংগ্রহ করা পুঁটি, টাকি, টেংরা, মেনি, পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নারী শ্রমিকরা পরিষ্কার করছেন। এরপর বিশাল বাঁশের মাচা বা স্থানীয় ভাষায় ‘ডাঙ্গি’র ওপর মাছ ছড়িয়ে দুই থেকে তিন দিন রোদে শুকানো হচ্ছে।

স্থানীয় শুঁটকি ব্যবসায়ী হারেছ মিয়া জানান, মাছের প্রকারভেদ অনুযায়ী ১০০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে মাছ কেনা হয়। শুকানোর পর এসব শুঁটকি আকার ও মান অনুযায়ী ৮ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করা হয়। এক মৌসুমে তিনি প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ মণ শুঁটকি বিক্রি করেন।

আরেক ব্যবসায়ী নাঈম মিয়া জানান, চৌগাঙ্গা এলাকাতেই প্রায় ৫০টি শুঁটকি ডাঙ্গি রয়েছে। এছাড়া কুলিয়ারচর, নিকলী, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামেও গড়ে উঠেছে অসংখ্য শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র।

আরও পড়ুন
aaa

বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণে সময় দেওয়ার সুপারিশ জাতিসংঘ কমিটির

কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের ‘বড় বাজার’ চ্যাপা শুঁটকির অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতি সপ্তাহে বুধবার ও বৃহস্পতিবার সেখানে বসে জমজমাট শুঁটকির হাট। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতি হাটেই কয়েক কোটি টাকার শুঁটকি কেনাবেচা হয়। বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি চ্যাপা শুঁটকি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে নিয়মিত পার্সেল ও বাণিজ্যিকভাবে চ্যাপা শুঁটকি পাঠানো হচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের মধ্যেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মুজিবুর রহমান বেলাল বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে শুঁটকি শিল্প স্থানীয় মৎস্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ খাতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। একই সঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, কিশোরগঞ্জে বছরে প্রায় ৯৬৬ দশমিক ৮৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি উৎপাদিত হয়। সারা বছর সংরক্ষণ করা যায় এবং বাজারে এর স্থায়ী চাহিদা থাকায় শুঁটকি ব্যবসা লাভজনক ও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের মতে, কিশোরগঞ্জের চ্যাপা শুঁটকি শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি হাওরাঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

আরটিভি/ এসকেডি