শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬ , ০৮:২৯ পিএম
স্বপ্নের পদ্মা ও মধুমতি সেতু চালুর পর রাজধানী ঢাকার সাথে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটেছে। কমেছে পথের দূরত্ব, সাশ্রয় হচ্ছে মূল্যবান সময়। কিন্তু দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুই মেগা প্রকল্পের শতভাগ সুফল নড়াইলবাসীর জন্য এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে।
ঢাকা-বেনাপোল জাতীয় মহাসড়কের ভাটিয়াপাড়া-বেনাপোল অংশটি এখনও প্রশস্ত না করায় এই রুটটি এখন পরিণত হয়েছে এক ‘মৃত্যুকূপে’। নড়াইলবাসীর দীর্ঘদিনের আশা ছিল এই মহাসড়কটি হবে আধুনিক ও নিরাপদ, কিন্তু গত আড়াই বছরে এখানেই অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ জন মানুষ।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মধুমতি সেতু উদ্বোধনের পর ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের চলতি জুন মাস পর্যন্ত নড়াইল-বেনাপোল মহাসড়কে ছোট-বড় অন্তত ৭৫টি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে দুর্ঘটনাস্থলে কিংবা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৫ জন। আর গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন প্রায় ১৫০ জন মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে পার হওয়ার পর মধুমতি সেতু হয়ে নড়াইল-বেনাপোল সড়কের প্রায় ৭০ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত সরু। বর্তমানে সড়কটি মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত। পদ্মা ও মধুমতি সেতু চালুর পর এই সড়কে ঢাকা, যশোর, বেনাপোল, কলকাতা, সাতক্ষীরা, খুলনা, মাগুরা ও কুষ্টিয়াগামী যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাস এবং ভারী পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এই সরু রাস্তায় চলছে তীব্র যানজট আর গাড়িগুলোর বিপজ্জনক ওভারটেকিং প্রতিযোগিতা। ক্রসিং বা ওভারটেকিংয়ের সময় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় চাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যানবাহনগুলো খাদে কিংবা বিপরীতমুখী অন্য গাড়ির ওপর আছড়ে পড়ছে। ফলে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ, পঙ্গু হচ্ছে মানুষ।
২০২২ সালের ১০ অক্টোবর কালনা এলাকায় দেশের প্রথম ছয় লেনের দৃষ্টিনন্দন 'মধুমতি সেতু' উদ্বোধন করা হয়। সেতুর সংযোগ সড়কগুলো আধুনিক ও প্রশস্ত করা হলেও ভেতরের মূল সড়কটি রয়ে গেছে আগের মতোই অবহেলিত।
নড়াইল জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলী হাসান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পদ্মা ও মধুমতি সেতুর কারণে আমাদের যাতায়াত সহজ ও স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাস্তা প্রশস্ত না করায় সেই সুবর্ণ সুযোগ এখন আমাদের জন্য আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ পথচারী, যাত্রী এবং আমাদের পরিবহন শ্রমিকরা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। নড়াইলবাসীর এই দুর্ভোগের শেষ কোথায়? আমরা অবিলম্বে এই রাস্তা ৪ লেনে উন্নীত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
নড়াইল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম সমস্যার সত্যতা স্বীকার করে জানান, নড়াইল জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক হলো এই ভাটিয়াপাড়া-বেনাপোল সড়কটি। হঠাৎ যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, আপাতত সাময়িক সুরক্ষার জন্য আমরা সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যাল ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তবে নড়াইলবাসীর জন্য আশার কথা হলো, মহাসড়কটি স্থায়ীভাবে প্রশস্ত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে এবং চলতি ২০২৬ সালের শেষের দিকেই আমরা এর বাস্তব কাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার বেনাপোল স্থলবন্দরের সাথে রাজধানীর সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগের স্বার্থে এবং নড়াইলের সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ৭০ কিলোমিটার সড়ক দ্রুত চার লেনে উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি। নড়াইলবাসীর আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর কোনো কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই সড়কটি প্রশস্ত করে মেগা প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ সুফল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
আরটিভি/এমএম