images

দেশজুড়ে

মায়ের হাত ধরে দুই প্রজন্মের জন্ম, আস্থার নাম হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ১০:৫২ এএম

একই স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে এক পরিবারের দুই প্রজন্মের সন্তানের জন্ম—এমন বিরল অভিজ্ঞতা গড়ে তুলেছে দীর্ঘ আস্থার সম্পর্ক। মানিকগঞ্জের হুমাইয়ারা নিলুফা বেগমের সেবার প্রতি সেই আস্থার কথাই জানালেন রফিজা আক্তার, যিনি নিজেও এবং তার সন্তানের ক্ষেত্রেও পেয়েছেন একই হাতে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবসেবা।

মানিকগঞ্জের হাটিপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক প্রসবসেবার সঙ্গে যুক্ত হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম এখন স্থানীয়দের কাছে আস্থার এক পরিচিত নাম। প্রায় ৩৬ বছরের সেবামূলক জীবনে তিনি প্রায় ১০ হাজার প্রসূতির নিরাপদ প্রসবে ভূমিকা রেখেছেন।

তবে এই সেবার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে রফিজা আক্তারের অভিজ্ঞতায়। তিনি বলেন, আমার মেয়ের জন্মও হুমাইয়ারা ভাবির হাতেই স্বাভাবিক প্রসবে হয়েছিল। আজ আমি আবার আমার মেয়ের প্রসব করাতে এসেছি। তিনি খুব যত্ন নিয়ে ব্যথামুক্তভাবে প্রসব করান। আমরা তার ওপর ভরসা পাই।

তিনি আরও জানান, আমার মেয়ের প্রথম সন্তানও তিনি প্রসব করিয়েছেন। এখন দ্বিতীয় প্রসবের সময়ও আমরা তার কাছেই এসেছি।

১৯৯০ সালের ১১ জানুয়ারি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরোয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে প্রথম চাকরিতে যোগদান করেন তিনি। এরপর হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়ন, সিংগাইর উপজেলার জামশা ও শায়েস্তা ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে দীর্ঘ ২৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২৩ সালে অবসরে যান।

চাকরিজীবনে তিনি অসংখ্য প্রসূতি মাকে নিরাপদ মাতৃত্বসেবা দিয়েছেন। পুরো সময়জুড়ে বিনামূল্যে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে সন্তান জন্মদানে কাজ করেছেন। তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানবিক সেবার কারণে হাজারো পরিবার তাকে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা হিসেবে দেখেছে। মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে নিলুফার ভূমিকা ছিল অনন্য।

ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে অনুপ্রেরণার গল্প। তার স্বামী পান্নু মিয়া ছিলেন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার। প্রায় ১০ হাজার স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন করার পেছনে তার স্বামীরও বিশেষ ভূমিকা ছিল। দুই বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তার শেষ ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে নিজ এলাকা হাটিপাড়া ইউনিয়নে ১০ শয্যাবিশিষ্ট একটি বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই হাসপাতালেই তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্প খরচে স্বাভাবিক প্রসবসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার কাছে সন্তান প্রসব করাতে আসেন।

হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম মিডওয়াইফারি ও মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তার প্রতি মানুষের আস্থা অনেক বেশি। তিনি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৫টি সফল স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন করেন। তার সেবার ধারাবাহিকতায় এমবিবিএস পাস করা তার ছোট ছেলেও শহরে না গিয়ে মায়ের সঙ্গে গ্রামে থেকে মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৫টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকেও রোগীরা সেবা নিতে আসেন।

রফিজা আক্তারের মতো আরও অনেক সেবাগ্রহীতা জানান, নিরাপদ ও কম ব্যয়ে স্বাভাবিক প্রসবের কারণে তারা এখানে ভরসা পান।

বালিরটেক গ্রামের খাদিজা বেগম বলেন, এখানে কাটা-ছেড়া ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে প্রসব করানো হয়, তাই আমরা আস্থা রাখি।

নিলুফা বেগমের ছেলে ডা. হিফজুল আল মঈন বলেন, অত্র এলাকায় কোনো হাসপাতাল নেই। আমার আব্বুর ইচ্ছাতেই মায়ের সঙ্গে এই হাসপাতাল পরিচালনা করছি। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—মা ও শিশুর মৃত্যুহার কমানো এবং গ্রামের মানুষের পাশে থেকে সঠিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া।

সদ্য ভূমিষ্ঠ এক পুত্রসন্তানের মা বলেন, ওনাদের ওপর ভরসা পাই। এই হাসপাতালের খোঁজ পেয়ে এখানেই নিয়মিত চেকআপ করিয়েছি। গতকাল এখানে ভর্তি হয়েছি, আজ আমার পুত্রসন্তান হয়েছে। আমরা দুজনই সুস্থ আছি। বাইরে অন্য হাসপাতালে গেলেই নানা অজুহাতে শুধুমাত্র সিজারের পরামর্শ দেওয়া হয়।

হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম আরটিভিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, শিশু ও মায়েদের মৃত্যুহার কমাতে আমি স্বাভাবিক প্রসব করানো শুরু করি। পরবর্তীতে সরকার থেকে আমাকে এ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়। ৩৬ বছরে আমি প্রায় ১০ হাজার শিশু প্রসব করিয়েছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর স্বামীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আমি ও আমার ছেলে মিলে এই হাসপাতাল পরিচালনা করছি। খুবই স্বল্প মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রসবসেবা দিয়ে থাকি। আমরা চাই গ্রামের মানুষ সচেতন থাকুক, মা ও শিশুর মৃত্যুঝুঁকি কমুক এবং সবাই সুচিকিৎসা পাক।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন ডা. আইভী ফেরদৌস বলেন, আপনি যে বিষয়টি বললেন, তা আপনার মাধ্যমেই জানলাম। আমি অবশ্যই খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকার থেকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে। যারা স্বাভাবিক প্রসবে অভিজ্ঞ এবং বেশি বেশি স্বাভাবিক প্রসব করিয়ে থাকেন, তাদের আমরা পুরস্কৃত করে থাকি।

দীর্ঘ এই সেবাযাত্রায় হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম এখন গ্রামীণ মানুষের কাছে শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, বরং নিরাপদ মাতৃত্বের এক আস্থার প্রতীক।

আরটিভি/টিআর