মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ০১:২০ পিএম
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের ঐতিহাসিক সাদ্রা দরবার শরিফের পীরজাদা হাম্মাদ চৌধুরী ও বাকী বিল্লাহ মিশকাত চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওমরাহ যাত্রীদের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ওমরাহ কাফেলার প্রধান মাওলানা মো. গোলাম মাওলা চেক ডিজঅনারের মামলা করেছেন। অভিযুক্তরা একই ব্যক্তি ছাড়াও আরও ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিবন্ধন ছাড়া ‘এসবি ওভারসিজ’ নামে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখেছেন।
সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে, মামলা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দেওয়া অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার আইনগিরি গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে মাওলানা মো. গোলাম মাওলা বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমে অভিযুক্ত হাম্মাদ ও মিশকাতের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি এর আগে বিভিন্ন ওমরাহ এজেন্সির মাধ্যমে যাত্রীদের সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন। নিজ জেলা ও পীরজাদা পরিচয়ের কারণে হাম্মাদ ও মিশকাতের প্রতি আস্থার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ওমরাহ যাত্রীদের পাঠানোর জন্য টাকা লেনদেন শুরু করেন।
৬৫ জন ওমরাহ যাত্রীর জন্য গোলাম মাওলা নগদ এবং ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৯৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা লেনদেন করেন। এর মধ্যে কিছু টাকা হাম্মাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয় এবং বাকি নগদ টাকা হাম্মাদের পিতা মুহাম্মদ যাকারিয়া চৌধুরীর হাতে প্রদান করা হয়।
ভুক্তভোগী গোলাম মাওলা বলেন, আমি হোসাইনিয়া হজ্জ কাফেলা নামে এর আগে কয়েকবার যাত্রীদের ওমরাহ সম্পন্ন করেছি। ২০২৫ সালে হাম্মাদ ও মিশকাত চৌধুরীর অনুরোধে তাদের মাধ্যমে যাত্রী পাঠানোর কাজ শুরু করি। ওই বছরের ১৪ জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তারা আমার কাছ থেকে ৯৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা নেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে ওমরাহ যাত্রী পাঠাতে গড়িমসি করেন। এতে তাদের প্রতি সন্দেহ সৃষ্টি হয় এবং মতবিরোধ দেখা দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি, তাদের ‘এসবি ওভারসিজ’ নামে প্রতিষ্ঠানের কোনো নিবন্ধন নেই।
তিনি আরও বলেন, তারা যাত্রী পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে আমাকে ভুয়া ভিসা ও বিমান টিকিট দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তারা আমাকে ২০ লাখ ও ২৫ লাখ টাকার দুটি চেক দেন ইসলামী ব্যাংকের। ওই চেকগুলোতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় আমি হাম্মাদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় ঢাকার এমএম আদালতে দুটি মামলা করি। নির্ধারিত তারিখে তিনি আদালতে উপস্থিত হননি। তার বাবা যাকারিয়া চৌধুরী সন্তানের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানান। বর্তমানে হাম্মাদ ঢাকায় আত্মগোপনে এবং মিশকাত চৌধুরী বিদেশে রয়েছেন। বিষয়টি আমি চাঁদপুর জেলা প্রশাসককে মৌখিকভাবে এবং পুলিশ সুপারের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছি।
তিনি জানান, অভিযুক্তদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারের জন্য তিনি সামাজিকভাবে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তারা শুধু তার নয়, আরও অনেক ওমরাহ যাত্রীর টাকা নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত দেওয়া এবং ওমরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
আরেক ভুক্তভোগী কুমিল্লার মুরাদনগরের নছরুল্লাহ হুসাইন বলেন, আমার ১৭৬ জন ওমরাহ যাত্রীর ভিসা ও বিমান টিকিট বাবদ মিশকাত চৌধুরী তার দুই ভাই হাম্মাদ ও ইয়াহিয়া চৌধুরীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা নিয়েছেন। কাজ সম্পন্ন না করে আমাকে ৭৫ লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়। সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আমি ওই চেকের বিপরীতে কুমিল্লা আদালতে দুটি মামলা করেছি। শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হতে পারে। এ ধরনের প্রতারণায় আমি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য হাম্মাদ চৌধুরী ও মিশকাত চৌধুরীর ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তারা রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে এসব ঘটনার বিষয়ে অবগত রয়েছেন হাম্মাদ ও মিশকাতের বাবা মুহাম্মদ যাকারিয়া চৌধুরী। তিনি মুঠোফোনে বলেন, ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক। তারা নিজেরাই ব্যবসা করে। এসব বিষয়ে আমাকে জড়ানো ঠিক নয়। মামলায় আমাকে জড়ানো হয়েছে, কিন্তু আমি কোনো নগদ অর্থ গ্রহণ করিনি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। এসব ঝামেলার কারণে আমি এখন ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি না। লোকজন আমাকে জড়িয়ে ঝামেলা করে।
আরটিভি/টিআর