রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬ , ০৭:২৪ পিএম
বরিশাল নগরীর অগ্রণী (আবাসন) হাউজিং লিমিটেডের কার্যালয়ে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর করে অণ্ডকোষ চেপে ধরে চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে দেশজুড়ে। গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় সংঘটিত এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালের হওয়ার পর ইতোমধ্যে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও তার সহযোগী আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। লিটু বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তার কোনও পদ-পদবি নেই। তার আরেক ভাই মাহবুবুর রহমান পিন্টু বরিশাল নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
এদিকে, সেদিন কী ঘটেছিল নিজ মুখে তা বর্ণনা করেছেন আব্দুল আজিজ হাওলাদার নামে ভুক্তভোগী সেই ব্যবসায়ী। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন তিনি।
ভুক্তভোগীর বর্ণনা অনুযায়ী, গত ২৭ জুন সন্ধ্যায় নিজ অফিস কক্ষে বসে কয়েকজনকে নিয়ে চা পান করছিলেন এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদার। ওই সময় হঠাৎ চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি ভেতরে ঢোকেন এবং সবাইকে বের করে দিয়ে কালো জামা পরিহিত এক ব্যক্তি আব্দুল আজিজকে জাপটে ধরেন এবং তাকে চড়থাপ্পড় মারাসহ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। পরে দুটি চেকে ও দুটি স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। কালো জামা পরিহিত ব্যক্তি মোস্তাফিজুর রহমান লিটু। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, এমডি আব্দুল আজিজ তার কক্ষে বসে চা পান করছিলেন এবং দুই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় চার জন যুবক কক্ষে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে কালো জামা পরা মোস্তাফিজুর রহমান সবার শেষে কক্ষে ঢুকে প্রথমে সেখানে উপস্থিত অন্যদের বাইরে বের করে দেন। এরপর তিনি আব্দুল আজিজের কাছে গিয়ে হঠাৎ তাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় জাপটে ধরেন। এতে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে আব্দুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে উপস্থিত আরেক ব্যক্তি তার পা টেনে ধরেন। পরে তিনি দাঁড়িয়ে গেলে মোস্তাফিজুর রহমান তাকে একাধিকবার চড় মারেন। এরপর দুজনের মধ্যে কথোপকথন হলেও তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, মারধরের একপর্যায়ে আব্দুল আজিজের অণ্ডকোষ চেপে ধরেন মোস্তাফিজুর রহমান। সেইসঙ্গে দুটি সাদা চেক ও দুটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিতে চাপ দেওয়া হয়। পরে আব্দুল আজিজকে ওই চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে দেখা যায়।
ঘটনার সময় আব্দুল আজিজকে ‘বাচ্চু, বাচ্চু’ বলে একজনকে ডাকতে শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি কক্ষে প্রবেশ করলে তাকে অল্প সময়ের জন্য আটকে রেখে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেওয়া হয়। ভিডিওতে স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেক ও স্ট্যাম্প গ্রহণের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করতে দেখা যায়। ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় মোস্তাফিজুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘হাসেন... হাসেন।’
আব্দুল আজিজ জানান, একসময় তাদের আবাসন ব্যবসার অংশীদার ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিন বছর আগে বিনিয়োগের বিপরীতে তার মূলধন ও লভ্যাংশ হিসাব করে সমপরিমাণ জমি তাকে হস্তান্তরের মাধ্যমে হিসাব নিষ্পত্তি করা হয়। ওই সময় কোনও পাওনা নেই—এমন অঙ্গীকারনামাও দেন মোস্তাফিজুর রহমান।
আব্দুল আজিজের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে মোস্তাফিজুর রহমান তার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলেন। কিন্তু, তার সঙ্গে সব ধরনের হিসাব আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় ওই অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন আব্দুল আজিজ। এর পরিপ্রিক্ষেতে গত ২৭ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোস্তাফিজুর তার কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে অফিসে ঢুকে তাকে (আবদুল আজিজ) মারধর করেন এবং জোরপূর্বক ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি ব্যাংকে অভিযোগ করায় ওই চেক থেকে টাকা তুলতে পারেননি মোস্তাফিজুর রহমান। এই ঘটনায় তিনি গত বৃহস্পতিবার বরিশাল অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছেন। বিচারক এস এম শরিয়ত উল্লাহ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘ওই সময় আমার অণ্ডকোষ এমনভাবে চেপে ধরেন মোস্তাফিজুর, যে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল আমার। এরপর আমাকে চেয়ার থেকে ফেলে দেয়। আমার বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে। মোস্তাফিজুর আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল এবং বলেছিল আমাদের চেক দেন। ওই অবস্থায় জীবন বাঁচাতে সাদা চেক ও দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়েছি।’
এ ব্যাপারে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. আশিক সাঈদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আমাদের মিডিয়া সেলকে বিষয়টি জানানো হয়। একইসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থা ও কোতোয়ালি থানা পুলিশকে মাঠে নামিয়ে আজ রবিবার দুপুরে লিটুসহ দুজনকে গ্রেপ্তার। তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইমদাদ হুসাইন বলেন, বিষয়টি পুলিশ কমিশনার জানার সঙ্গে সঙ্গে কোতোয়ালি থানা পুলিশকে জানানো হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে ওই দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
আরটিভি/এসএইচএম