মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৩:০৫ পিএম
পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শরীয়তপুরসহ আশেপাশের কয়েক জেলার মানুষ। সেতু চালুর পর ঢাকার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের স্বপ্ন দেখালেও, জমি অধিগ্রহণের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ছয় বছরেও আলোর মুখ দেখেনি শরীয়তপুর-নাওডোবা সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প। নির্ধারিত সময়সীমা গত ৩০ জুন পার হয়ে গেলেও এখনো প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ কাজ বাকি পড়ে আছে। ফলে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন ও যাত্রী ভাঙাচোরা রাস্তা আর ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছেন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালে শরীয়তপুর থেকে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়ের নাওডোবা পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার এই মেগা প্রকল্প অনুমোদন পায়। ২০২১ সালে কাজ শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও নকশা ও জমি বুঝে না পাওয়ায় ঠিকাদাররা বর্তমানে কাজ বন্ধ রেখেছেন। পুরো কাজের প্রায় ৯ কিলোমিটার অংশে এখনো মাটির কাজই শুরু করা যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রকল্পের মেয়াদ তৃতীয় দফায় বাড়ানোর আবেদন করেছে সওজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা। ২৭ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণের জন্য ২৬০ একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। তবে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন এখন পর্যন্ত সওজ-কে মাত্র ১৮২ একর জমি বুঝিয়ে দিতে পেরেছে। বাকি ৭৮ একর জমির মালিকানা ও আইনি জটিলতার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত স্থানে কাজ শুরু করতে পারছে না।
৪৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজকে তিনটি প্যাকেজে ভাগ করা হলেও ভূমি জটিলতায় প্রতিটি প্যাকেজই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্যাকেজ-১ (জেলা শহর থেকে জাজিরা): এই অংশে প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকার জমি এখনো বুঝে পাওয়া যায়নি।
প্যাকেজ-২ (জাজিরা থেকে নাওডোবা): এই ১২ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটার অংশে কাজ থমকে আছে।
প্যাকেজ-৩ (সেতু নির্মাণ): কীর্তিনাশা নদীর ওপর কাজীরহাট সেতুর নির্মাণকাজও জমির অভাবে আংশিক সম্পন্ন করে ফেলে রাখা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদর উপজেলার কোটাপাড়া এলাকায় কীর্তিনাশা নদীর উপর নতুন একটি দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মিত হলেও এর দুই পাশের সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) তৈরি হয়নি। ফলে চালকরা বাধ্য হয়েই পুরোনো, নড়বড়ে সেতুটি ব্যবহার করছেন। একই অবস্থা জাজিরার কাজীরহাট সেতুরও। এছাড়া মতিসাগর থেকে নাওডোবা পর্যন্ত ৪টি কালভার্টের কাজ মাঝপথে বন্ধ থাকায় পুরো সড়কটি খানাখন্দে পরিণত হয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর এই সড়কটি এখন কেবল শরীয়তপুর নয়, বরং মাদারীপুর, বরিশাল ও চাঁদপুরের একাংশের মানুষের জন্য ঢাকার প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন এই সরু ও ভাঙা পথ দিয়ে প্রায় এক হাজার যানবাহন চলাচল করে, যার ফলে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ যানজট ও ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
ভুক্তভোগী বাসচালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর এক্সপ্রেসওয়ে শেষ হতেই শুরু হয় চরম ভোগান্তি। ৯ কিলোমিটারের এই বেহাল সড়কের কারণে ঢাকাগামী যাত্রীদের কয়েক গুণ বেশি সময় অপচয় করতে হচ্ছে এবং যানবাহনেরও ক্ষতি হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে শরীয়তপুর সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেন জানান, প্রকল্পের সিংহভাগ কাজ শেষ হলেও মূলত জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশে কাজ স্থবির হয়ে আছে। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এই সংকটের সমাধান খোঁজা হচ্ছে। যেহেতু নির্ধারিত সময় শেষ, তাই কাজ সম্পন্ন করতে পুনরায় মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন পাঠানো হয়েছে।
আরটিভি/এমএইচজে