images

দেশজুড়ে

১২০০ ফলজ গাছ কেটে কৃষকে নিঃস্ব করে দিল বন বিভাগ

শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ , ০৬:৫০ পিএম

গাছে গাছে ঝুলে থাকা সোনালি কমলা আর মাল্টা বিক্রি করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিল একটি পরিবার। আট বছরের শ্রম, পরিচর্যা, বিনিয়োগ আর ঋণের বোঝা পেরিয়ে যখন ফলনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন তারা, ঠিক তখনই বন বিভাগের করাত নেমে এলো সেই স্বপ্নের বাগানে।

অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ দখল উচ্ছেদের নামে কেটে ফেলা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০টি কমলা ও মাল্টা গাছ। মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা একটি বাগান। এখন সেখানে ফলের গাছের বদলে পড়ে আছে কাটা গাছের স্তূপ। বাগানকে ঘিরে পরিবারের যে ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে ছিল, তা যেন এক নিমিষেই ভেঙে পড়েছে।

Screenshot_2026-07-24_184756

ঘটনাটি ঘটেছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায়। সম্প্রতি বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক।

প্রায় আট বছর আগে পাহাড়ি ওই এলাকায় কমলা ও মাল্টার চারা রোপণ শুরু করেন সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লাহ। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিশাল ফলের বাগান। বছরের পর বছর শ্রম, পরিচর্যা ও অর্থ বিনিয়োগের পর চলতি মৌসুমেই প্রথম বড় পরিসরে ফলন পাওয়ার আশা করেছিলেন তারা।

আরও পড়ুন
05

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তে ৩৪ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাই মাল জব্দ

ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, আর মাত্র তিন মাস পর বাগান থেকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করা সম্ভব হতো। বাগানের গাছগুলোতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার ফল ধরেছিল। কিন্তু ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই উচ্ছেদ অভিযানের নামে কেটে ফেলা হয় প্রায় ১ হাজার ২০০টি গাছ।

বাগানের মালিক আলিম উল্লাহর অভিযোগ, বন বিভাগের লোকজনকে চাঁদা না দেওয়ায় তার বাগানটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

Screenshot_2026-07-24_184818

বাগানের মালিক আলিম উল্লাহ, “বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই ২০১৮ সালে আমরা কমলা ও মাল্টার বাগান করি। আট বছর ধরে শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করেছি। বাগানে ফলন আসার পরপরই গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। বন বিভাগের লোকজনকে চাঁদা না দেওয়ায় এই সর্বনাশ করা হয়েছে।”

একই অভিযোগ সালমা বেগমেরও। তার দাবি, আশপাশে আরও বাগান থাকলেও সেগুলো উচ্ছেদ না করে শুধুমাত্র তাদের বাগানটি ধ্বংস করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাছ কাটার পাশাপাশি বাগানের সেচকাজে ব্যবহৃত মেশিনও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়েও অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি।

তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছে বন বিভাগ। তাদের দাবি, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে দখল করে গড়ে ওঠা বাগান উচ্ছেদের অংশ হিসেবেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

কমলগঞ্জ রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক প্রীতম বড়ুয়া বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদের অংশ হিসেবে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। চাঁদা দাবির যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা সত্য নয়।”

Screenshot_2026-07-24_184846

তবে এই ঘটনায় উঠেছে নানা প্রশ্ন। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই ২০১৮ সালে তারা বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। যদি বাগানটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে আট বছর ধরে সেটি কীভাবে টিকে থাকল? এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

স্থানীয়দেরও প্রশ্ন, একটি ফলজ গাছ ফলন দেওয়ার উপযোগী হতে দীর্ঘ সময় লাগে। দীর্ঘ আট বছর ধরে পরিচর্যার পর যখন বাগানে ফলন এসেছে, ঠিক সেই সময় কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো? আশপাশে থাকা অন্যান্য বাগানের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। 

এদিকে আলিম উল্লার বাগানের কমলা ও মাল্টার গাছ কাটার বিষয়টি নজর কাড়ে প্রশাসনের। এঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পর্যন্ত পৌছে যায়। প্রকৃত ঘটনা তদন্তে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আশরাফুর রহমান, কমিটির সদস্য সিলেট বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুর রহমান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শাহিনা আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

Screenshot_2026-07-24_184906

কমিটির প্রধান আশরাফুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়েছি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি। সবকিছু পর্যালোচনা করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে। এরপর সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।

উল্লখ্য, গত ১৬ জুলাই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় বন বিভাগ সরকারি জমি উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে কৃষকের ১২০০ ফলধরা কমলা ও মাল্টা গাছ কেটে ফেলা হয়।

এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, বাগানটি কীভাবে গড়ে উঠেছিল, বন বিভাগের অনুমতির বিষয়টি কী ছিল, উচ্ছেদ অভিযান আইনসঙ্গত ছিল কি না এবং চাঁদা দাবির অভিযোগের সত্যতা, সবকিছু নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

একটি পরিবারের আট বছরের শ্রম, স্বপ্ন আর বিনিয়োগের পরিণতি এখন পড়ে আছে কাটা গাছের স্তূপে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই থেকেই যাচ্ছে। যদি বাগানটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে আট বছর ধরে সেটি টিকে থাকল কীভাবে? আর ফলন আসার ঠিক আগমুহূর্তেই কেন নামল বন বিভাগের করাত?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন খুঁজছেন ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং তদন্ত কমিটি।

আরটিভি/ এসকেডি