শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ , ১১:৫৫ এএম
বাংলাদেশ রেলওয়ের মালামাল চুরি ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে পদ্মা রেললাইনে চলছে চুরির উত্সব। এছাড়া রেলওয়ের ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশন ও পদ্মা-ভাঙা সেকশনসহ বিভিন্ন স্টেশনে রেলওয়ের মালামাল চুরি হচ্ছে। এসব সেকশনসহ সব জায়গায় গোয়েন্দা তত্পরতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সম্প্রতি রেলভবনে অনুষ্ঠিত মাসিক পরিচালন পর্যালোচনা সভায় বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন।
চুরির ধরন: রেলওয়েতে সাধারণত রেললাইনের যন্ত্রাংশ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং স্টেশনের ফিক্সচার সবচেয়ে বেশি চুরি হয়। এর মধ্যে ক্লিপ, ফিশপ্লেট, নাট-বল্টু, তামার তার, সিগন্যাল কেবল, এবং ট্রেনের ভেতরের লোহার যন্ত্রাংশ ও কাচের জানালা চুরির ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের দামি কপার বা তামার তার ও সিগন্যাল কেবল, বিভিন্ন স্টেশনের জানালার কাচ, দরজা, এবং রেলওয়ে কারখানার ক্যারেজ ও ওয়াগন মেরামতের লোহার টুল বা খুচরা যন্ত্রাংশ।
পদ্মা রেললাইন: ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার নতুন রেললাইন দেশের অন্যতম বৃহত্ রেল অবকাঠামো প্রকল্প। প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে এই প্রকল্প। জনবলসংকট, সীমিত ট্রেন চলাচল এবং যথেষ্ট নিরাপত্তা না থাকার সুযোগে ব্যয়বহুল এ রেলপথের বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা।
সূত্র জানায়, নতুন রেললাইন থেকে প্রায় ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোর অংশ ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি) এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি বিস্তারিত চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে পুরো প্রকল্প করিডর জুড়ে নিয়মিত চুরি ও নাশকতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিগন্যাল সরঞ্জাম ও তার চুরির কারণে ঝকঝকে নতুন এই লাইনের কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এটি ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা: শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, যন্ত্রাংশ চুরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্লক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে এবং ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময় বেশি লাগছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলওয়ের কর্মীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তারা।
শিবচরের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, সরঞ্জাম চুরি বেড়ে চলেছে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, ঘনঘন ট্র্যাক পট চুরির কারণে ট্রেন পরিচালনায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। পুলিশ টহল অনেক কমে গেছে। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষায় রেলপথে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।
নতুন স্টেশন হলেও লোকবল নেই: পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ১৭টি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং তিনটি পুরোনো স্টেশন সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার করা স্টেশনগুলো হলো—কমলাপুর, কাশিয়ানী ও ভাঙ্গা। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১২টি স্টেশনে ট্রেন থামে এবং যাত্রী ওঠানামা করতে পারে। চালু থাকা স্টেশনে বর্তমানে কেবল কয়েক জন অস্থায়ী ওয়েম্যান ও প্রহরী দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে স্টেশনগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় ফাঁকাই থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্টেশন ভবনগুলো ব্যবহার না হওয়ার কারণে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় চুরির ঘটনা ঘটে চলেছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, জনবল সংকটের কারণে চুরি ঠেকানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে আমরা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়িছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমা স্টেশন স্থাপন এলাকায় । পাশাপাশি রেললাইনের পাশে স্থাপিত গুরুত্ব যন্ত্রাংশ নিরাপত্তায় লোহার শক্ত খাঁচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেলওয়ের নিজম্ব নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) লোকবল সিমিত। এ কারণে সব স্টেশনে আরএনবি সদস্য নিয়োজিত নেই।
আরটিভি/এসএস