images

দেশজুড়ে

‘টেবিলের তলে দেহি সাপ ফুটবলের মতো গোল অইয়া রইছে’

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ , ১১:৩৯ এএম

বেহাল দশা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভলাকুট ইউনিয়নের খাগালিয়া গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকের। চারদিকে থইথই পানি। তার মাঝখানে কংক্রিটের পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ ভবন। বেশ কিছু পিলারের পলেস্তারা খসে পড়ে রড বের হয়ে গেছে। কোনো সংযোগ সড়ক নেই, নেই কোনো ঘাট। বর্ষার দিনে এই ভবনটিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় নৌকা, সাঁতার কিংবা কোমরপানি ভেঙে হাঁটা। 

এটিই খাগালিয়াসহ আশপাশের চার গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ভরসা। কিন্তু বছরের চার থেকে পাঁচ মাস যখন হাওরে পানি জমে, তখন মানুষের সেবাদাতা এই ভবনটি নিজেই যেন অসহায় হয়ে পড়ে থাকে। 

ক্লিনিকের দিকে কোমরপানি ভেঙে যাওয়ার পথে দেখা মেলে ৭৫ বছর বয়সী রূপচাঁন বিবির। খাগালিয়া গ্রামের এই প্রবীণ নারী আক্ষেপ করে বলেন, ‘গত সপ্তাহে এই হাসপাতালে আইছিলাম গ্যাস্টিকের বড়ি নিতাম। কিন্তু কোমরসমান পানি ভাইঙা হাসপাতালে আইতে অইছে। ওষুদ নিয়া যাওনের সময় পানির নিচে কিছু একটা কামড় দিছে। হের পর থেইক্যা পাওডা (পা) ফুইল্যা ঢোল অইয়া আছে। সাতদিন ধইরা পাও লইয়া কষ্ট করতাছি। শরীর ভালা করতে হাসপাতালে গিয়া অহন আমি নিজেই আধমরা।’ 

রূপচাঁন বিবির মতো দুর্দশা এই অঞ্চলের অন্তত চার গ্রামের মানুষের। শুকনো মৌসুমে গ্রামের মেঠো আইল দিয়ে হাঁটা গেলেও বর্ষায় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন। 

খাগালিয়ার এই ক্লিনিকে ২২ ধরনের প্রাথমিক ওষুধ ও সেবা দেওয়া হয়। একজন সিএইচসিপি প্রতিদিন এবং সপ্তাহে এক দিন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা এখানে বসেন। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৮০ জন রোগী এলে বর্ষায় তা নেমে আসে ১০-২০ জনে। মূলত সাপ ও জোয়ারের পানির আতঙ্কে মানুষ এখন ক্লিনিকবিমুখ। 

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল বারেক (৫০) বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমার নাতিরে নিয়া গেছিলাম। টেবিলের তলে দেহি এক হাত লম্বা সাপ ফুটবলের মতো গোল অইয়া রইছে। ভয়ে ওষুদ না নিয়াই ফিরা আইছি।’ 

আমেনা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘বন্যার সময় ছয় মাস হাসপাতাল পানির নিচে থাকে। আমরা মহিলা মানুষ ইচ্ছা করলেই পানি দিয়া আইতে পারি না। বাড়িত ছোড দুইডা পোলা জ্বরে ভুগতাছে। কিন্তু পানির কারণে আইতে পারি না।’ 

যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় গত বছর বর্ষায় মাঝরাতে প্রসব বেদনা উঠলে খাগালিয়া গ্রামের রাফিয়া বেগমকে (২৫) নৌকায় করে সদরে নেওয়ার পথে নৌকা ডুবে বিপত্তি ঘটে। অল্পের জন্য মা ও শিশু রক্ষা পেলেও সেই আতঙ্ক এখনও কাটেনি গ্রামবাসীর। এই ক্লিনিকটি সচল থাকলে তাদের ১৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হতো না। 

বৃহস্পতিবার গিয়ে দেখা যায়, ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে। ভেতরে প্রবেশ করতেই কয়েকটি ইঁদুর দৌড়ে পালানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। বেলা ১১টার দিকে দেখা মেলে কয়েকজন নারী কোমরপানি পেরিয়ে ক্লিনিকে আসছেন। আবার কেউ আসছেন নৌকায় করে।

ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মো. আরিফ রহমান বলেন, কখনও নৌকা পাই, কখনও পাই না। নৌকা না পেলে সাঁতরে আসতে হয়। ক্লিনিকে ঢোকার আগে লাঠি দিয়ে মেঝেতে শব্দ করতে হয় যাতে সাপ চলে যায়। ভবনটিও ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি পিলার ফেটে রড বের হয়ে গেছে। ছাদ দিয়ে পানি পড়ে ওষুধ ও ফাইলপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিবেশে নিরাপদ সেবা কঠিন।’ 
১৯৯৮ সালে এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১১ সালে স্থানীয় এক ব্যক্তির দান করা নিচু জমিতে ভবনটি তৈরি হয়। তবে প্রতিষ্ঠার এক যুগেও যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা তৈরি হয়নি। 

ভলাকুট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রুবেল মিয়া বলেন, ক্লিনিকের রাস্তাটি করার জন্য আমরা একাধিকবার পরিষদ থেকে প্রকল্প নিয়েছি। কিন্তু জমিটি নিচু হওয়ায় পরিষদের সীমিত বাজেটে এটি সম্ভব হচ্ছে না। 

আরও পড়ুন
4

লেনদেনে ১০০ টাকা কম দেওয়ার ১৫ বছর পর মুখোমুখি দেনাদার-পাওনাদার

নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খাগালিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ভৌগোলিক অবস্থানটি প্রতিকূল। বর্ষায় যাতায়াতের সমস্যার কথা চিন্তা করে সেখানে একটি উঁচুপথ নির্মাণ এবং ভবনটি আরও উঁচুতে পুনর্নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত সীমিত সম্পদের মধ্যেই আমাদের কর্মীরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’ 

আরটিভি/এসএস