মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬ , ১০:২৪ পিএম
বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ সরকারি কার্যালয়। দরজায় সরকারি সাইনবোর্ড, ভেতরে দাপ্তরিক কক্ষ। কিন্তু একটু ভেতরে গেলেই দৃশ্য বদলে যায়। অফিসের কক্ষেই বিছানা, রান্নার সরঞ্জাম, বাজারের ব্যাগ, বিশ্রামকক্ষ—সব মিলিয়ে যেন সরকারি অফিস নয়, বরং একটি আবাসিক ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে।
লালমনিরহাটে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) জেলা (রিজিয়ন) কার্যালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কয়েকজন কর্মচারী নিয়মিত অফিসেই অবস্থান করছেন। রান্নাবান্না থেকে রাত্রিযাপন—সবই চলছে সরকারি অফিসের ভেতরে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিজস্ব ভবন না থাকায় একটি দোতলা ভবন ভাড়া নিয়ে বিএমডিএর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের নিচতলায় সরকারি মালামাল সংরক্ষণের জন্য একটি স্টোররুম থাকলেও সেখানে সরকারি সরঞ্জামের চেয়ে সাংসারিক জিনিসপত্রই বেশি দেখা যায়। সাজানো বিছানা, রান্নার চুলা, হাঁড়ি-পাতিলসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী সেখানে রাখা হয়েছে।
নিচতলার ওই কক্ষটি ব্যবহার করছেন খাইরুল ইসলাম নামে এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তিনি মূলত সদর বিএমডিএর দায়িত্বে থাকলেও অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জেলা কার্যালয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রণের কাজও করছেন।
দোতলায় উঠলে দেখা যায়, সামনে দুটি টেবিল, ভেতরে হিসাবরক্ষকের কক্ষ এবং পাশেই নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষ। তার সঙ্গে রয়েছে থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদার একটি সুসজ্জিত বিশ্রামকক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী যোগদানের পর থেকেই ওই কক্ষে তার রাত্রিযাপন ও রান্নাবান্না চলছে। এমনকি তাকে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে একজন নারী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার বেতন সরকারি কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্বাহী প্রকৌশলীর দেখভালের জন্য মাস্টার রোলে আরও তিনজন অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা দিন-রাত পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া সরকারের দেওয়া গাড়িটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে বগুড়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম বলেন, তিন বছর আগে অফিসটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। স্যার মাঝেমধ্যে ভেতরের কক্ষটি রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি আশপাশে কোনো বাসা ভাড়া নেননি। যেদিন অফিস করেন, সেদিন সেখানেই থাকেন। আমাদের রান্নার জন্য একজন খালা আছেন।
খাইরুল ইসলামের বিষয়ে তিনি বলেন, তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনিও বাসা ভাড়া না নিয়ে অফিসের নিচতলায় থাকেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যাশ শাখা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং রাতে অফিস পাহারা দেন।
অস্থায়ী কর্মচারী মিঠুন চন্দ্র রায় বলেন, আমরা চারজন অস্থায়ী কর্মী এখানে কাজ করি। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা এবং রাত ৮টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পালাক্রমে ডিউটি করি। স্যারের কক্ষের পাশে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে, মূলত সেখানেই নির্বাহী প্রকৌশলী থাকেন। আর নিচের কক্ষে থাকেন আমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
রান্নার দায়িত্বে থাকা অস্থায়ী কর্মী ময়না বেগম বলেন, আমি অফিসে রান্না করি। মিটিং থাকলে কিংবা স্যারের খাবারের প্রয়োজন হলে রান্না করতে হয়। ওপরের কক্ষে স্যার বিশ্রাম নেন এবং রাতে ঘুমান।
অফিসের সামনের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মানিক মিয়া জানান, খাইরুল ইসলাম ও ময়না বেগম প্রায়ই তার দোকান থেকে অফিসের জন্য শাকসবজি ও অন্যান্য বাজারসামগ্রী কিনে নিয়ে যান। নির্বাহী প্রকৌশলী যোগদানের পর থেকেই এ কেনাকাটা চলছে।
অফিসে গিয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খাইরুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ছুটি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসেছি। আগে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। কিন্তু স্যার আমাকে বাসা ছেড়ে দিয়ে অফিসে থাকতে বলেছেন। এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হয়। আমি সেখানে থাকতে চাই না। কিন্তু স্যার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় বাধ্য হয়ে অফিসেই থাকি এবং রান্না করে খাই।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী, সরকারি অফিস কক্ষ বা চত্বর কোনোভাবেই বসবাসের স্থান নয়। সেখানে রান্নার সরঞ্জাম বা শোয়ার ব্যবস্থা রাখা সরকারি স্থাবর সম্পত্তির ব্যবহারবিধি ও কর্মপরিবেশের নীতিমালার পরিপন্থি। অফিসে রান্নার চুলা ব্যবহার অগ্নিঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা সরকারি নিরাপত্তা বিধানেরও লঙ্ঘন। দাপ্তরিক জরুরি দায়িত্ব বা নাইট গার্ড ছাড়া অন্য কোনো কর্মীর অননুমোদিত রাত্রিযাপন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদা বলেন, আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ভূমি বরাদ্দের আবেদন করেছি। আপাতত ভাড়া ভবনেই কার্যক্রম পরিচালনা করছি। জনবল সংকটের কারণে অফিস পাহারার জন্য কয়েকজনকে মাস্টার রোলে রাখা হয়েছে।
থাকা ও রান্নার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। দূর-দূরান্ত থেকে কোনো কর্মকর্তা এলে কিংবা রাত হয়ে গেলে তাদের থাকার সুবিধার জন্য এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওপরের ও নিচের বেডরুমগুলো আমার ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, অতিথিদের জন্য রাখা হয়েছে। আমি সেখানে থাকি—এ অভিযোগ সঠিক নয়। তবে অফিস চলাকালে বাইরের হোটেলের খাবার না খেয়ে এখানে রান্না করে খাই।
উল্লেখ্য, কৃষকদের সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে কুড়িগ্রাম থেকে আলাদা করে ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লালমনিরহাটে বিএমডিএর জেলা কার্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। তবে সেবার মানোন্নয়নের পরিবর্তে সরকারি অফিসের এমন ব্যবহার ও অপব্যবহারের অভিযোগ সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
আরটিভি/এসএস