বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ , ০৭:১৫ এএম
চট্টগ্রামে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড দেখালেও অন্যদিকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মানুষ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিপিডিবি) দাবি, চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। তবে উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলছে।
দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও ছোট শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণার মধ্যেও চট্টগ্রামবাসীর প্রশ্ন, এত বিদ্যুৎ যাচ্ছে কোথায়?
বিপিডিবির স্বয়ংক্রিয় প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সোমবার (৩ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগে বেলা ১১টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ২৬১ দশমিক ২ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যা ৭টায় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াটে। এটিই ছিল দিনের সর্বোচ্চ উৎপাদন। একই সময়ে চট্টগ্রাম থেকে জাতীয় গ্রিডে দুপুরে ১ হাজার ৮৫২ দশমিক ২ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ২ হাজার ৪ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামের নিজস্ব চাহিদা ছিল দুপুরে ১ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ১ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৩৯৫ মেগাওয়াট ও ১ হাজার ৩২৮ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। ফলে সরকারি হিসাবে দুপুরে ১৪ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ৫৯ দশমিক ১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে এ ঘাটতি প্রায় ৬৩ মেগাওয়াটের কাছাকাছি ওঠানামা করেছে।
সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে এসএস পাওয়ার বাঁশখালী ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসএস পাওয়ার বাঁশখালী দুপুরে ১ হাজার ২১৪ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। মাতারবাড়ী কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে যথাক্রমে ১ হাজার ১৩৩ মেগাওয়াট ও ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট। শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে দুপুরে ২১৩ মেগাওয়াট ও সন্ধ্যায় ২০৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে।
অন্যদিকে, ২১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রাউজান-১ ও রাউজান-২ কেন্দ্র দুটি সারা দিন বন্ধ ছিল। কেইপিজেড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকেও কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। টেকনাফ সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র দুপুরে ১০ দশমিক ১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও সন্ধ্যায় তা শূন্যে নেমে আসে। কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রেও একই অবস্থা দেখা গেছে।
মহানগরীর মেহেদীবাগ, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, বাকলিয়া ও পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দারা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ থাকছে না। গরমের মাত্রা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে বিদ্যুতের সমস্যা।
মেহেদীবাগ আমিরবাগ এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ কাজল বলেন, ‘সবসময় দেখি চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি। প্লান্টও তো কম নয়। কিন্তু আমাদের এলাকায় দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ যায়। গরমে যে কষ্ট পাচ্ছি, তা আর সহ্য হচ্ছে না।’
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার চিকিৎসক রুহুল কবির বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্না, পড়াশোনা—সবই ব্যাহত হয়। এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ যায়, বলার মতো না।’
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক দোকানে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রি কমে যাচ্ছে।
একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অফিসপ্রধান জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। অফিস স্থানান্তরের কারণে এখন বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে না পারায় সময়মতো নিউজ ফুটেজ পাঠানো যাচ্ছে না। এমনকি লাইভ প্রগ্রাম সম্প্রচারেও বিঘ্ন ঘটছে।
বিষয়টি নিয়ে বিপিডিবির সহকারী পরিচালক আকবর হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রামে উৎপাদন বেশি হলেও এর বড় অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। কোথাও কোথাও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেও সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি।’
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিবেদনে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তরের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। রবিবার দুপুরে পানির স্তর ছিল ১০১ দশমিক ৭৩ ফুট, যা সন্ধ্যায় সামান্য কমে ১০১ দশমিক ৬৮ ফুটে দাঁড়ায়। রুল কার্ভ অনুযায়ী নির্ধারিত মান ছিল ৮৯ দশমিক ৩২ ফুট। অর্থাৎ বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে।
আরটিভি/ এসকেডি