বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬ , ০২:৪২ পিএম
দেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক মধুর উৎস সুন্দরবনে চলতি মৌসুমের মধু আহরণ কার্যক্রম বুধবার (১ এপ্রিল) শুরু হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও এপ্রিল ও মে— এই দুই মাস মৌয়ালরা বন থেকে মধু সংগ্রহের অনুমতি পেয়েছেন। তবে মৌসুমের শুরুতেই সামনে এসেছে বনদস্যুদের ভয়ংকর চাঁদাবাজির অভিযোগ, যা নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন মৌয়ালরা।
অভিযোগ উঠেছে, জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি এড়াতে বাধ্য হয়ে অনেক মৌয়াল দুই মাসের জন্য মাথাপিছু ২১ হাজার টাকার বিনিময়ে বনদস্যুদের সঙ্গে অলিখিত ‘চুক্তি’ করে বনে প্রবেশ করছেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই অর্থ বিভিন্ন দস্যু বাহিনীর মধ্যে ভাগ করে দিতে হয়— ‘দয়াল’ বাহিনীকে সাত হাজার, ‘নানাভাই’ বাহিনীকে পাঁচ হাজার, ‘জোনাব’ বাহিনীকে ছয় হাজার এবং ‘দুলাভাই’ বাহিনীকে তিন হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে নির্দিষ্ট এলাকায় ‘নিরাপত্তা’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এসব বাহিনী।
মৌয়ালদের দাবি, এই টাকা সরাসরি দস্যুদের হাতে না দিয়ে স্থানীয় কিছু সহযোগীর মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। তারা আগাম অর্থ সংগ্রহ করে দস্যুদের কাছে পৌঁছে দেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনে পরিচালিত হলেও এলাকাজুড়ে এটি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে পরিচিত।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নেওয়ার পরও বনের ভেতরে কার্যকর কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় প্রায়ই বনদস্যুদের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে আগেই টাকা দিয়ে ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল গণমাধ্যমকে বলেন, বনে গেলে ডাকাতের হাতে পড়ব না— এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা দাবি করে, মারধরও করে। তাই আগে থেকেই টাকা দিলে অন্তত নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়।
পায়রা এলাকার মৌয়াল শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা সারা বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু এখন মধু আহরণ মানেই ভয়ের মধ্যে থাকা। অনুমতি থাকলেও বাস্তবে কোনো নিরাপত্তা নেই। টাকা না দিলে অপহরণ করে নির্যাতন চালায়।
একই এলাকার আরেক মৌয়াল জানান, বনদস্যুদের এই চাঁদাবাজি এখন সবার জানা থাকলেও কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কারণ, পরবর্তীতে প্রতিশোধের আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, মৌয়ালদের মহাজন শরীফ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অন্য বছর ৭ থেকে ১০টি নৌকা প্রস্তুত করে মৌয়াল পাঠাতাম। কিন্তু এবার দস্যুদের চাঁদা দাবির কারণে এখনো একটি নৌকাও প্রস্তুত করতে পারিনি।
মধু আহরণ মৌসুমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের দস্যুরা আমাদের আশপাশেই রয়েছে। সবাই সচেতন হয়ে সাহসের সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। সঠিক তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। নিজেদের মধ্য থেকেই দস্যুদের চিহ্নিত করতে পারলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হবে।
মৌসুমের শুরুতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় সুন্দরবনে মধু আহরণ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আরটিভি/এমএইচজে