images

অর্থনীতি

আওয়ামী সরকারের পতনের পর পাল্টেছে ব্যাংক ঋণের চিত্র

মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫ , ০২:৩০ পিএম

ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর দেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী সরকারের সময় ব্যাংক থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া ছিল নিয়মিত ঘটনা। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন সরকার ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ করছে না, বরং আগের ঋণ পরিশোধ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (৩০ জুন থেকে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত) সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে আগের নেওয়া ৫০৩ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময় সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল প্রায় ১৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংকঋণ প্রবাহে বড় ধরনের উল্টো পরিবর্তন ঘটেছে।

৩০ জুন ২০২৫ তারিখে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের মোট নেট ঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা ৩০ অক্টোবর কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার ৪০১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়।

আরও পড়ুন
8485458

নভেম্বরের ৯ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহে ৪৮.৭ শতাংশ বৃদ্ধি

শুধু ৩০ অক্টোবর এক দিনেই সরকারের নেট ঋণ কমেছে এক হাজার আট কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর বড় অংশ এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স’ ঋণ পরিশোধের কারণে। ওই দিন সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকে ৮৯৯ কোটি টাকা এবং তফসিলি ব্যাংকগুলোতে দুই হাজার ৫৪১ কোটি টাকা ফেরত দিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণ না নিয়ে সরকার অ-ব্যাংক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ৯ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা ঋণ করেছে সরকার। জাতীয় সঞ্চয়পত্রের নিট অবস্থান বাদ দিলে দেশীয় উৎস থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা।

সরকারের ব্যাংকঋণ কমার পেছনে অন্যতম কারণ হলো—অপ্রয়োজনীয় ও অলাভজনক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাতিল করা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকারহীন বহু প্রকল্প স্থগিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি চলমান অনেক উন্নয়ন প্রকল্পেও ব্যয়সংযম নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, ফলে ব্যয়ের গতি কমেছে। উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি ও প্রকল্প পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সরকারের তহবিল চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে, যা ব্যাংকঋণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় গত বছরের তুলনায় ভালো। সেই সঙ্গে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবস্থান শক্ত হওয়ায় ব্যাংকঋণ না নিয়ে উল্টো ঋণ পরিশোধ সম্ভব হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ব্যাংকঋণ কমা একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাসে সহায়ক, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সুযোগ বাড়াচ্ছে। এতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি যদি দীর্ঘ সময় ধরে ধীর থাকে, তবে তা বিনিয়োগ স্থবিরতা ও প্রবৃদ্ধি হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি বাড়াতে পারে কর্মসংস্থান।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের ভাষায়, সরকার পরিবর্তনের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে না পারলেও দেশের আর্থিক নীতিতে এসেছে বড় ধরনের শৃঙ্খলা। নতুন প্রশাসন অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করে, ব্যাংকঋণ নির্ভরতা কমিয়ে, অ-ব্যাংক উৎস ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে অর্থনীতিতে স্বল্প মেয়াদে স্থিতিশীলতা এসেছে, তবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কার্যকর উন্নয়ন ব্যয় ও বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখাই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ব্যাংক ঋণ কমার পেছনে অন্যতম কারণ হলো অপ্রয়োজনীয় ও অলাভজনক উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাতিল করা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকারহীন বহু প্রকল্প স্থগিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি চলমান অনেক উন্নয়ন প্রকল্পেও ব্যয়সংযম নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, ফলে ব্যয়ের গতি কমেছে। উন্নয়ন ব্যয়ের এই ধীরগতি ও প্রকল্প পর্যালোচনা প্রক্রিয়া সরকারের তহবিল চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে, যা ব্যাংক ঋণ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধারা। আগের সরকারের সময় ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার ফলে বাজারে অতিরিক্ত টাকা প্রবাহিত হয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসন রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এনেছে এবং ব্যয় সংযমে মনোযোগ দিয়েছে।

আরটিভি/এফএ