শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , ০৭:৩৮ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়া তিন বছরের জন্য স্থগিতের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। যেসব কারণ দেখিয়ে উত্তরণ পেছানোর কথা বলেছে, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এখন সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখবে সংস্থাটি।
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) আবেদনটি পর্যালোচনা করবে। ২৩ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে এ কমিটির পাঁচ দিনব্যাপী একটি বৈঠক শুরু হয়েছে।
সিডিপি সদস্য এবং এর এনহ্যান্সড মনিটরিং মেকানিজম (ইএমএম) উপকমিটির প্রধান দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে কমিটি। তবে আবেদনটি পর্যালোচনার জন্য গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর বিষয়টি এরইমধ্যে অনুমোদিত হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, সিডিপি প্রথমে সরকারের উত্থাপিত যুক্তিগুলো যাচাই করবে। এরপর তারা তাদের সুপারিশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) পাঠাবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যাবে। সিডিপির সিদ্ধান্ত জানতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর এটি ধারাবাহিকভাবে ইকোসক ও সাধারণ পরিষদে যাবে। বাংলাদেশ কোনো 'অপ্রত্যাশিত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির কারণে' সংকটে আছে কি না, তা যাচাই করে দেখবে সিডিপি।
কমিটি উত্তরণ পেছানোর সুপারিশ করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবেদনটি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই কেবল এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে।
এছাড়া এলডিসি থেকে ইতিমধ্যে বেরিয়ে যাওয়া ও উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় চলতি সপ্তাহে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ইএমএম উপকমিটির। বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওস উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঢাকা ছাড়ার আগে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটি সেশনে বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই দেশগুলো এ পর্যন্ত কতটা উন্নতি করেছে এবং চলতি বছরের শেষে তারা উত্তরণের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা যাচাই করা হবে।
বর্তমান শিডিউল অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। উত্তরণের আগে তৃতীয় ও চূড়ান্ত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এখন চলমান। দায়িত্ব গ্রহণের পরদিনই নতুন সরকার ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এই উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানায়। ১৮ ফেব্রুয়ারি সিডিপির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত চিঠি পাঠানো হয়।
চিঠিতে বাংলাদেশ উল্লেখ করেছে, উত্তরণের তিনটি শর্ত—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক—পূরণ অব্যাহত থাকলেও পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময়কাল বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা ধাক্কায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সরকার এক্ষেত্রে কোভিড মহামারীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বিশ্বব্যাপী কঠোর আর্থিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতির পুনরুদ্ধারের কথা উল্লেখ করেছে।
অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে আর্থিক খাতের অনিয়ম, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তন ও বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়ার চলমান চাপের কথা জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, এসব অভিঘাতের ফলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। তাছাড়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বৃদ্ধি, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি হ্রাস এবং কম বিনিয়োগের কারণে নতৃন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও কমেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের নীতিগত মনোযোগ স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে সরে যাওয়ায় কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়কালটি আশানুরূপভাবে কাজে লাগানো যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্কারোপের ঝুঁকি।
ইএমএমের অধীনে সংকট মোকাবিলা বিধানটি ব্যবহার করে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে এবং তার স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির আওতায় অগ্রাধিকারমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য তিন বছরের সময় বৃদ্ধি চেয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং চলমান মূল্যায়নের ফলাফলের ওপরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
আরটিভি/এমএ