বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬ , ০১:৩৯ পিএম
প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতে অস্বস্তিকর খেলাপি ঋণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এসব মিলিয়ে অর্থনীতি এখন চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রভাব। সামনে এলডিসি উত্তরণ থাকায় অর্থনীতিকে শুধু স্বাভাবিক ধারায় ফেরানো নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় প্রস্তুত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত এক সেমিনারে জানানো হয়, ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমেছে, বিনিয়োগেও অনীহা দেখা গেছে। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে ওঠায় আংশিক পুনরুদ্ধারের আভাস মিলেছে, যদিও তা টেকসই কি না সেটিই প্রশ্ন।
সিপিডি বলছে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে এলেও মানুষের স্বস্তি সীমিত। মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম থাকায় আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা ভোগব্যয় ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে।
ঋণপ্রবাহে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি নির্দেশ করে যে উদ্যোক্তারা হয়তো ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চিত, কিংবা উচ্চ সুদ ও ব্যাংকিং ঝুঁকির কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিপরীতে সরকারের ঋণগ্রহণ বেড়েছে, ফলে ‘ক্রাউডিং আউট’-এর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শ্রেণিকরণ চালুর পর ৩০ শতাংশের বেশি পর্যায়ে রয়েছে। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সাময়িক স্বস্তি মিললেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তৈরি পোশাক খাতে ধীরগতি ও বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস এর মূল কারণ। একই সময়ে আমদানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ, বিশেষ করে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানির কারণে। এটি উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা গতি থাকার ইঙ্গিত দেয়। তবে বৈদেশিক কর্মসংস্থানও ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এতে প্রবাসী আয় বেড়ে ১৯ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় রিজার্ভ শক্তিশালী হয়েছে। তবুও প্রবাসী আয়ের ওপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সিপিডি আরও জানায়, এলডিসি উত্তরণের ফলে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা কমে গেলে রফতানি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তাই বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি।
সব মিলিয়ে অর্থনীতি ভাঙনের মুখে না থাকলেও চাপের বৃত্তে আবদ্ধ। আস্থা ফিরিয়ে আনা, নীতির সমন্বয় ও কাঠামোগত সংস্কারই নতুন সরকারের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার। এখনকার সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনে অর্থনীতির গতি কোন পথে যাবে।
আরটিভি/এসকে