images

অর্থনীতি

বন্ধ কারখানা চালুতে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকব: গভর্নর

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ , ১২:৪৫ পিএম

বন্ধ কারখানা চালু করতে এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংক পাশে থাকবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। 

রোববার (২৯ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকের কনফারেন্স রুমে ঢাকার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের বিজনেস এডিটর, সিনিয়র সাংবাদিক ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় তিনি এ কথা জানান।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, কিছু কারখানা আগেই বন্ধ হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর আরো কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সেই কারখানাগুলোকে কিভাবে আবার উৎপাদনে নিয়ে আসা যায়, সেটা আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। 

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকগুলোকে আমরা সহায়তা করার কথা বলছি, যাতে তারা উৎপাদনে ফিরে এসে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করে প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যথায় কারখানার সম্পদ দিন দিন নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্যাংক টাকা ফেরত পাবে না।

সভায় বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সব দিক নিয়ে সাংবাদিকদের পরামর্শ শোনেন গভর্নর। পাশাপাশি ডেপুটি গভর্নররা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন। 

গভর্নর বলেন, দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে যে আস্থা দরকার, সেটা তৈরিতে সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকও কাজ করছে। বড় উদ্যোক্তাদের, যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছেন, তাদের পাশে থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

তিনি বলেন, কিছু বড় উদ্যোক্তার সঙ্গে আমরা বসেছি। আরও বসব। তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। 

আর্থিক খাত ‘রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত’ রাখার জোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, আমাদের আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা পরিবর্তন আনতে চাই। আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে, আর্থিক খাতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়। চেষ্টা করছি, ব্যাংক খাতে যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব না আসে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই গভর্নর বলেন,  আমাদের সহকর্মীদের বারবার বলছি, কারও কথা আপনারা শুনবেন না। সেই ধরনের চাপ আমি নিজের ঘাড়ে নিতে রাজি।

আরও পড়ুন
Web-Image10

‘বাংলাদেশ ন্যায্য ও উন্নয়নমুখী বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’

পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপ নিয়েও এ সময় কথা বলেন তিনি। 

মোস্তাকুর রহমান  বলেন, পাচারের অর্থ ফেরত আনার বৈশ্বিক সাফল্য খুব কম। তারপরও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ জন্য সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, এসব অর্থ সাধারণ আমানতকারীদের টাকা। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা উদ্ধার করে আমানতকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান ও মামলা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় দেওয়ানি মামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, আমরা এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। পেশাদার ব্যাংকার নিয়োগের মাধ্যমে আমরা এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চাই।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে সেবার মান বাড়ে। 

কৃষি খাতে সহায়তা বাড়াতে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা সম্প্রসারণ এবং নতুন কয়েকটি পুনরর্থায়ন স্কিম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে সভায় জানান মোস্তাকুর রহমান। একইসঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে বলেও জানান তিনি। 

সভায় গভর্নর বিনিয়োগ না বাড়া, রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক ধারা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার চেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।

মতবিনিময়সভায় জানানো হয়, ৬০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল জুন থেকে ঋণ বিতরণ শুরু করবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। 

গভর্নর বলেন, নতুন উদ্যোক্তা তথা স্টার্টআপ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা তহবিলটা দ্রুত চালুর চেষ্টা করছি। এপ্রিল থেকে শুরু হবে এবং জুন মাস থেকে বিতরণ শুরু হবে। যেসব স্টার্টআপ কর্মসংস্থান তৈরি করবে, সেগুলো অগ্রাধিকার পাবে। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি করেই অর্থনীতি বড় করতে হবে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি করতে গ্রামীণ অর্থনীতি দিয়ে শুরু করতে হবে। সরকার কৃষিঋণ মওকুফসহ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এ সময় কর-জিডিপির অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন গভর্নর। 

তিনি বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে এ ক্ষেত্রে আরও উন্নতি হবে বলে আশা করছি।

সভায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় একগুচ্ছ নীতিগত পদক্ষেপ ও বিকল্প পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। ইতিবাচক দিক হিসেবে বলা হয়, যুদ্ধ তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত চললেও আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল এবং বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা কম। 

গভর্নর বলেন, ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ কমাতে দুই বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স ২ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। 

তিনি বলেন, জুন মাসে আইএমএফ থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে কম দামে বা অনুদান হিসেবে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। 

তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ উল্লেখ করে মোস্তাকুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেকার হয়ে দেশে ফিরতে পারেন। এতে রেমিট্যান্স কমার পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া আইএমএফ জ্বালানিতে ভর্তুকি না দেওয়ার চাপ দিতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা সরকারের পরিচালন বাজেটে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। এ কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হওয়া প্রয়োজন।

আরটিভি/আইএম