বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ , ০২:১৭ পিএম
বৈষম্য হ্রাস এবং রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় বাজেটে দেশের ধনী ব্যক্তিদের আয়করের ওপর সারচার্জের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ সম্পদ কর চালুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্পদের মূল্যের উপর ভিত্তি করে এই সম্পদ কর আদায় করা হবে।
নতুন এ ব্যবস্থাকে ধনীদের ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বর্তমান সারচার্জ ব্যবস্থা ধনীদের ওপর কার্যকরভাবে কর আরোপে ব্যর্থ এবং এটি কর ব্যবস্থার প্রগতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করে। প্রচলিত সারচার্জ ধনী ব্যক্তিদের আয়করের সঙ্গে কয়েক শতাংশ অর্থ যোগ করে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত মোট সম্পদ করমুক্ত থাকবে, এরপর পরবর্তী ২ কোটি টাকার উপর ০.২৫ শতাংশ, তার পরের ৫ কোটি টাকার উপর ০.৫০ শতাংশ, আরও ৫ কোটি টাকার উপর ০.৭৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট সম্পদের উপর ১ শতাংশ কর ধার্য করা হবে।
মূল্যায়নের জন্য, জমি মৌজা হারে, ভবন গণপূর্ত বিভাগের হারে, সোনার বাজার মূল্যে এবং শেয়ার ক্রয়মূল্য বা নিট সম্পদ মূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে মূল্যায়ন করা হবে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালের আয়কর আইনের অধীনে বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্যে এই সংস্কারটি আনা হয়েছে, যেখানে উচ্চতর সম্পদ শ্রেণিতে কার্যকর সারচার্জের হার হ্রাস পায় এবং করের দায় ঘোষিত আয়ের উপর নির্ভর করে, যা কম ঘোষিত আয়ের ব্যক্তিদেরকে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রদেয় আয়করের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ আদায় করে। ১০০ কোটি থেকে ২০০ কোটি টাকার সম্পদের জন্য কার্যকর সারচার্জের হার প্রায় ০.৪৩ শতাংশ, যা ৫০-১০০ কোটি টাকার সম্পদের জন্য প্রযোজ্য ০.৫৪ শতাংশের চেয়ে কম।
২০২৫-২৬ করবর্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ হাজার ৮০৪ জন করদাতা সম্মিলিতভাবে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৩৫ কোটি টাকার মোট সম্পদ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু সারচার্জ আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট সম্পদের ০.২৯ শতাংশ।
সেইসঙ্গে সম্পদের কেন্দ্রীভবন অনেক বেশি; ১৩ জন করদাতার প্রত্যেকের গড় সম্পদ ৬৪৬ কোটি টাকা, যা মোট ঘোষিত সম্পদের ২.৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে, ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারী ১৮৬ জন ব্যক্তির দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ১২.১২ শতাংশ।
২৭ জন করদাতার একটি ক্ষুদ্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্পদের প্রকৃত মূল্য ঘোষিত মূল্যের চেয়ে ৮৯ শতাংশ বেশি হতে পারে, যা বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় সম্ভাব্য রাজস্ব ৩৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
একটি ক্ষেত্রে, শূন্য সারচার্জ দায় থাকা একজন করদাতাকে পুনর্মূল্যায়নের পর প্রায় ৪০ কোটি টাকার সম্পদ করের সম্মুখীন হতে হতে পারে।
কর্মকর্তারা অনুমান করছেন যে নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে মোট রাজস্ব প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে; অর্থাৎ অতিরিক্ত ২ কোটি টাকা আয় হবে এ ব্যবস্থায়।
নতুন প্রস্তাবে ২০২৬ সালের একটি সম্পদ কর আইন প্রণয়ন, একটি স্বয়ংক্রিয় ই-রিটার্ন-ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু, একটি স্থায়ী মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং একটি দ্বি-স্তরীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, যার নিয়মাবলী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পর্যালোচনা করা হবে।
অবশ্য, ধনীদের কাছ থেকে কর আদায়ের নতুন এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের বেশ কিছু ঝুঁকি আছে বলেও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে সম্পদের পরিমাণ কম দেখানো, পুঁজি পাচার এবং দুর্বল ডেটা পরিকাঠামোর কারণে অপ্রকাশিত সম্পদ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ।
তারা বলেছেন, নতুন ব্যবস্থায় প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জনের জন্য এই ব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সম্পদ ডেটাবেস, শক্তিশালী ডিজিটাল কর প্রশাসন এবং কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন হবে।
এদিকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সম্পদ কর চালু থাকলেও এই কর নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। নরওয়ে প্রায় ০.৮৫ শতাংশ কর আরোপ করে চলেছে এবং সুইজারল্যান্ড ক্যান্টন পর্যায়ে প্রায় ০.১ শতাংশ থেকে ১ শতাংশের বেশি হারে কর আরোপ করে। স্পেন প্রায় ৩ শতাংশ হারে তাদের সম্পদ কর পুনরায় চালু করেছে। এছাড়া, আর্জেন্টিনা মহামারীর পরে একটি অস্থায়ী কর চালু করেছিল।
অন্যদিকে, বিনিয়োগ সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ২০১৮ সালে তাদের এই ব্যবস্থা বাতিল করে দেয় ফ্রান্স। আর প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ পরিপালন ব্যয় এবং মূলধন বহির্গমনের কারণ দেখিয়ে এই ধরনের কর বাতিল করে দিয়েছে জার্মানি, সুইডেন এবং ডেনমার্ক।
আরটিভি/এসএইচএম