images

অর্থনীতি

বাজেট প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানাল বিজিএমইএ

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ , ০৯:৩৪ পিএম

অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা শিরোনামে’ ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনাকে সামগ্রিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

শনিবার (১৩ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়। 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিজিএমইএ জানায়, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে সচল রাখা, ব্যবসা সহজীকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দূরদর্শী প্রয়াসের জন্য অর্থমন্ত্রীকেও আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাচ্ছে বিজিএমইএ।

এতে আরও বলা হয়, বিজিএমইএ মনে করে ২০২৬-২৭ সালের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট জনকল্যাণমুখী ও ব্যবসাবান্ধব। এতে ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে সামগ্রিক উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতগুলোকে গুরুত্ব পেয়েছে, এসবই বাজেটের অনন্য দিক। বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, বিনিয়ন্ত্রণকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তাসহ ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দেশের শিল্প, বাণিজ্য এবং বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সহায়ক বলে বিজিএমইএ মনে করে।

এ ছাড়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত বাজেটের ইতিবাচক ও সংস্কারমুখী অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে বিজিএমইএ বলে:

বিজিএমইএর মতে, এবারের বাজেটে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নীতিগত স্থিতিশীলতা ও কর কাঠামোর ধারাবাহিকতা: বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের সুবিধার্থে কর কাঠামোর ধারাবাহিকতা অন্তত ৫ বছর বজায় রাখার পরিকল্পনা এবং এসআরও নির্ভরতা কমিয়ে 'রিস্ক বেইজড অডিট' চালু করার সিদ্ধান্ত দেশের শিল্পায়নে ব্যাপক আত্মবিশ্বাস জোগাবে।

আরও পড়ুন
Web-Image---Copy

ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার

নগদ সহায়তার বিপরীতে আয়কর কর্তনের হার হ্রাস: এ হার বর্তমানের ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

রাজস্ব ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ও স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড: অতিরিক্ত পরিশোধিত উৎসে কর ফেরত দেওয়ার জন্য 'Automated ও Faceless' রিফান্ড ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করদাতাদের বড় স্বস্তি দেবে।

ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজীকরণ: অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় অনলাইনভিত্তিক 'Single Window' বাধ্যতামূলক করা, ৭ দিনের মধ্যে লাইসেন্স প্রদান এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন সম্পন্ন করার উদ্যোগ ব্যবসা পরিচালনার সময় ও ব্যয় বহুলাংশে কমিয়ে আনবে। এ ছাড়াও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি, অর্থ প্রত্যাবাসন সহজীকরণ, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের জন্য ৭ দিনের মধ্যে ওয়ার্ক পারমিট প্রদানের বিধান ইত্যাদি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে আমরা মনে করি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ শিল্পের জন্য ঘোষণা: সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ০ শতাংশ কর হার, সৌরবিদ্যুৎ বিলে ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ শতাংশ কর রেয়াত এবং সৌর খাতের উপকরণ আমদানিতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত শুল্ক-কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার প্রস্তাবটি পরিবেশবান্ধব টেকসই শিল্পায়নে মাইলফলক হয়ে থাকবে। একই সাথে রিসাইকেল্ড পণ্যের করহার ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা এবং ইটিপি রাসায়নিক আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তকে বিজিএমইএ স্বাগত জানায়।

বন্ড ও ভ্যাট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা, প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারক হতে নন-বন্ডেড প্রত্যক্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পণ্য সরবরাহের অনুমোদন এবং প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক রিটার্ন দাখিলের বিধান ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনকারী শিল্পে রেয়াতি সুবিধা প্রদান: দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আগামী ৩০ জুন, ২০৩০ পর্যন্ত উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা প্রদান করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার: দেশে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধকল্পে সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্স আমদানিতে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে ০ শতাংশ করা হয়েছে।

সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি: স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় এবং অন্যায্য প্রতিযোগিতা রোধে সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কার ও অর্থায়ন সহজীকরণ: খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।

এসএমই ও নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত করা অত্যন্ত জনকল্যাণমুখী একটি পদক্ষেপ।

এছাড়াও, ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক্স’সহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে শিল্প ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিজিএমইএর প্রত্যাশা

প্রস্তাবিত বাজেটের উপর্যুক্ত সংস্কারমুখী ঘোষনাগুলো শিল্পের জন্য সহায়ক হবে বলে বিজিএমইএ মনে করে। তবে দেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতের সক্ষমতা রক্ষায় সংগঠনটি মনে করে শিল্পে কিছু নীতিগত সহায়তা প্রদান করা জরুরি, যেহেতু শিল্পটি বর্তমানে সংকটে রয়েছে। উল্লেখ্য যে, বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ, ইউনিট প্রতি গড় মূল্য ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণ ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে বিগত ৩ বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে বিজিএমইএর একান্ত প্রত্যাশা, পোশাক শিল্পের সংকট উত্তরণে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

১. উৎস কর হ্রাস: নতুন বাজেটে উৎসে কর হার পূর্বের ন্যায় ১ শতাংশ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে বর্তমান সংকট বিবেচনায় পোশাক রপ্তানির বিপরীতে এই কর ১ দশমিক ০০ শতাংশ হতে হ্রাস করে ০ দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্ধারণ এবং তা সরকারের ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি নীতির আলোকে আগামী ৫ বছরের জন্য স্থিতিশীল করার দাবি জানাচ্ছে।

২. নগদ সহায়তার ওপর আয়কর হ্রাস: বাজেটে নগদ সহায়তার বিপরীতে আয়কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ করায় বিজিএমইএ সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। তবে বর্তমান তারল্য সংকট বিবেচনায় এটি সম্পূর্ণরূপে মওকুফ (০ শতাংশ) করার জন্য আমরা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছে।

৩. সাব-কন্ট্রাক্ট প্রক্রিয়ায় দ্বৈত কর নিরসন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে সচল রাখতে সাব-কন্ট্রাক্ট মূল্যের ওপর থেকে ১ শতাংশ দ্বৈত উৎসে করের অবসান এবং ভ্যাট অব্যাহতি পদ্ধতি আরও সহজ করা প্রয়োজন।

৪. যৌক্তিক করপোরেট কর নিশ্চিতকরণ: পোশাক খাতের জন্য নির্ধারিত বিশেষায়িত করপোরেট ট্যাক্স হার (১২ শতাংশ এবং গ্রিন ফ্যাক্টরির জন্য ১০ শতাংশ) যেন অন্য কোনো আয়ের অজুহাতে বাড়িয়ে সাধারণ উচ্চ হারে অ্যাসেসমেন্ট না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. ম্যান-মেড ফাইবার ভিত্তিক তৈরি পোশাক রপ্তানির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে বাজেটে প্রস্তাবিত Polyester Staple Fibre (PSF) এর ওপর ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক, এবং PVC Resin ও PET Resin-এর ওপর প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

বিজিএমইএ মনে করে, পোশাক খাত কেবল দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী উৎসই নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ব্যবসায়ের খরচ কমানো, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং কাস্টমস ও বন্দর সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজতর করা প্রয়োজন।

বিজিএমইএ আশা করে যে, বাজেটে ঘোষিত বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত স্থিতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী বাজেটে বিজিএমইএর যৌক্তিক দাবিগুলো সদয়ভাবে বিবেচনা করবেন।

আরটিভি/এমএইচজে