images

অর্থনীতি

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ০৮:১৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক পেট্রোলিয়াম সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎকে অন্যতম কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগ আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, এ ধরনের অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি প্রমাণ করে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য পরিচ্ছন্ন বা সবুজ জ্বালানি এখন শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয় নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন, যা টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত করতে পারে।

শফিকুল আলম বলেন, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করায় ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য সরকারের সাম্প্রতিক বাজেট বরাদ্দ এবং সৌর প্যানেল আমদানিতে ১০ বছরের শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ।

তিনি বলেন, এ কর সুবিধা আরও সহজ করে সব উদ্যোক্তার জন্য উন্মুক্ত করা উচিত। 

পাকিস্তানের উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সেখানে এ ধরনের নীতিগত সুবিধার ফলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। 

তিনি বলেন, বর্তমানে কর-সুবিধা শুধু অনুমোদিত প্রকল্পের উদ্যোক্তারাই পাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ বা স্বতন্ত্র ক্রেতারা সৌর প্যানেল আমদানি করলে একই সুবিধা পান না, যা সৌরবিদ্যুতের প্রসারে একটি বড় বাধা।

ড. ইজাজ হোসেন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে। কারণ এটি সরাসরি জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তিনি বলেন, সহজ শর্তে ঋণ, নেট মিটারিংয়ের সম্প্রসারণ, দেশীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন নিশ্চিত করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সৌরবিদ্যুৎ খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। 

এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্ভরযোগ্য ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২৭ মে জাতীয় সংসদ ভবনে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা উদ্বোধনকালে বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১ হাজার ৮০৭ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এ সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ৮১৮ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার ১১টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইপিপি) সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এসব প্রকল্প ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে উৎপাদনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ২৯০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার আরও ১২টি সৌর প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, নিজস্ব পাওয়ার সেক্টর ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের অর্থায়নে দেশের ১৯টি স্থানে মোট ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলছে, যা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌর প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সবুজ জ্বালানির অংশ বাড়ানো যায়।

কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, গৃহস্থালি পর্যায়ে মানুষকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা গেলে সরকারের বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।

তিনি বলেন, এর মাধ্যমে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৭ (এসডিজি-৭) অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনও সহজ হবে।

আরও পড়ুন
19

১৯ দিনে রেমিট্যান্স এলো ২৩ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা

এদিকে, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর পার্ক নির্মাণ করছে, যা ২০২৭ সালের মাঝামাঝি উৎপাদনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার বলেন, প্রকল্পটি পূর্ববর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদন পেতে প্রথম দিকে জটিলতার মুখে পড়েছিল।

তবে বিপিডিবি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল হওয়া ২৭টি সৌর প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি পুনরায় চালু করেছে। একইসঙ্গে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় ট্যারিফ ৭ দশমিক ৮০ মার্কিন সেন্ট থেকে গড়ে ২ দশমিক ৫ সেন্ট কমানো হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকার বড় ধরনের কর প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শূন্য শুল্ক আরোপ উল্লেখযোগ্য। এ উদ্যোগ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে। 

এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি, বিশেষ করে লিথিয়াম-আয়ন, সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনে কর সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের বিল ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধকারীদের জন্য ৫ শতাংশ কর রেয়াতও রাখা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার। কেউ কেউ বলছেন, বিদ্যুতের বার্ষিক প্রায় ৭ শতাংশ চাহিদা বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ সবুজ জ্বালানি থেকে পূরণের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। বর্তমানে দেশের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮০৭ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

কর্মকর্তারা জানান, বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে নির্মাণাধীন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আগামী মাসে (আগস্ট) এ কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আরও ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন শুরু হতে পারে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি মালিকানাধীন অব্যবহৃত বা স্বল্প ব্যবহৃত জমিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার গত ১২ এপ্রিল ‘গাইডলাইনস ফর ডেভেলপমেন্ট অব রিনিউএবল এনার্জি প্রজেক্টস ইউজিং ল্যান্ড ওনড বাই গভর্নমেন্ট এজেন্সিস আন্ডার দ্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডালিটি, ২০২৬’ জারি করেছে।

এ উদ্যোগের লক্ষ্য সরকারি অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত জমিতে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ফেনীর সোনাগাজীতে ৪১২ একর জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে একটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য মে মাসে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশীয় উৎপাদন, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতামূলক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক ও রাজস্ব প্রণোদনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিডার কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর আমিনবাজার ও মাতুয়াইলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প দুটি থেকে যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এবং ২২১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চীনের সিএমইসি গ্রুপ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বি অ্যান্ড এফ কোম্পানিকে।

তারা জানান, নতুন হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সমতাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় (এলসিওই) গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কম। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় আরও কমবে বলেও তারা আশা করছেন।

বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক। তবে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকারকে ক্রমবর্ধমানভাবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৮০৭ দশমিক ৭৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের অবদান ১ হাজার ৫১৪ দশমিক ৬৬ মেগাওয়াট বা ৮৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ থেকে ২৩০ মেগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ৬২ মেগাওয়াট উৎপাদিত হচ্ছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) এক কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত গ্রিড বহির্ভূত এলাকায় ৬০ লাখের বেশি সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) স্থাপন করা হয়েছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, ফলে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর চাপ কমছে। সূত্র: বাসস

আরটিভি/আইএম