রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬ , ০৯:১০ পিএম
বাংলাদেশের দুগ্ধ খাতে ব্রুসেলোসিস একটি নীরব কিন্তু বড় অর্থনৈতিক হুমকি হয়ে উঠেছে। এ রোগে আক্রান্ত দুগ্ধবতী গাভীর দৈনিক গড়ে প্রায় এক লিটার দুধ উৎপাদন কমে যায়। প্রায় ২ হাজার ৭০০ গাভীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ কারণে খামারিরা প্রতিবছর প্রায় আড়াই কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক দুই বছর ধরে পরচালিত গবেষণায় এ তথ্য পেয়েছেন।
সরকারের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলডিডিপি)-এর অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অ্যানিমেল ডিজিজ-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক দল ইউএনবিকে জানান, খামারিরা সাধারণত গাভীর গর্ভপাত হলেই ব্রুসেলোসিসের কথা ভাবেন। কিন্তু লক্ষণহীন সুপ্ত সংক্রমণেও গাভীপ্রতি দৈনিক গড়ে প্রায় আধা লিটার এবং সক্রিয় সংক্রমণে প্রায় এক লিটার বা তারও বেশি দুধ উৎপাদন কমে যায়। ফলে খামারিরা না বুঝেই প্রতিদিন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
গবেষকরা পরামর্শ দেন, খামারে গর্ভপাত, গর্ভফুল আটকে যাওয়া, গাভী গরম না হওয়া বা বারবার প্রজননে ব্যর্থতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত।
গবেষণার নেতৃত্ব দেন বাকৃবির মেডিসিন বিভাগের ল্যাবরেটরি অব এপিডেমিওলজি অ্যান্ড প্রিভেন্টিভ মেডিসিনের অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান। গবেষক দলে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ড. এম আরিফুল ইসলাম, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক ডা. মো. শফিউল আলম, মাস্টার্স শিক্ষার্থী মো. নাজমুল ইসলাম লিজান, বিশ্ব জ্যোতি অধিকারী, শান্তা ইসলাম, আর এস মাহমুদ হাসান এবং মিল্কভিটার ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক মুহাম্মদ আকতারুজ্জামান।
অধ্যাপক ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বলেন, সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত একটি গাভী সুস্থ গাভীর তুলনায় দৈনিক গড়ে ১ দশমিক ০১ লিটার এবং সুপ্ত সংক্রমণে আক্রান্ত গাভী ০ দশমিক ৫৩ লিটার কম দুধ দেয়।
গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান দুধ উৎপাদনকারী অঞ্চলের ১৭টি বড় বাণিজ্যিক খামারের ২ হাজার ৬৯৬টি দুগ্ধবতী গাভীর তথ্য ও দুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক ল্যাব পরীক্ষার পাশাপাশি ‘বায়েসিয়ান মিক্সড-ইফেক্টস মাল্টিনোমিয়াল রিগ্রেশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে গাভীগুলোকে সুস্থ, সুপ্ত সংক্রমণ এবং সক্রিয় ব্রুসেলোসিসে আক্রান্ত—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
তিনি বলেন, সাধারণত ব্রুসেলোসিসকে শুধু ‘সুস্থ’ বা ‘আক্রান্ত’—এই দুইভাবে বিবেচনা করা হলেও এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো সুপ্ত সংক্রমণকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও এ ধরনের গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং পরবর্তীতে রোগটি সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রোগ শনাক্তে ব্যবহৃত আধুনিক গাণিতিক বিশ্লেষণে বাকৃবির গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছেন গ্রিসের থেসালি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ লেফটেরিস মেলেটিস ও পলিক্রোনিস কস্তুলাস।
গবেষণার অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বড় বাণিজ্যিক ডেইরি খামারগুলোতে শুধু ব্রুসেলোসিসের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি হতে পারে, যার বড় অংশই দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে হয়।
ক্ষতি কমানোর উপায় নিয়ে অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে পরিকল্পিত গণটিকাদানকে সবচেয়ে লাভজনক পদ্ধতি হিসেবে পাওয়া গেছে। এতে প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে গড়ে ৮ টাকা ১৪ পয়সা পর্যন্ত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। তবে আক্রান্ত গরু শনাক্ত করে খামার থেকে বাদ দেওয়ার পদ্ধতি সরকারি ভর্তুকি ছাড়া সাধারণ খামারিদের জন্য ব্যয়বহুল।
গবেষক দলের সদস্য ও জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শফিউল আলম বলেন, ব্রুসেলোসিস মানুষের জন্যও একটি বিপজ্জনক জুনোটিক রোগ। আক্রান্ত গরুর কাঁচা দুধ পান করা বা সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্রুসেলোসিস নিয়ন্ত্রণে উচ্চ ঝুঁকির গাভী দ্রুত শনাক্তকরণ, নিয়মিত রোগ নজরদারি, প্রজননস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং বড় খামারের পাশাপাশি ছোট খামারগুলোতেও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
আরটিভি/এমএ