images

করপোরেট কর্নার

ফার্মেসি থেকে স্কয়ার গ্রুপ, অনুপ্রেরণার বাতিঘর স্যামসন এইচ চৌধুরী

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ১২:৩৫ পিএম

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন যার, তাকে কি আটকে রাখা যায়? স্যামসন এইচ চৌধুরীকেও আটকে রাখা যায়নি। চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বেছে নিয়েছিলেন উদ্যোক্তা জীবন। প্রথমে ফার্মেসি ও পরে ১৯৫৬ সালে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজ বাড়িতেই তিনি একটি ছোট ওষুধ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। নাম দেন ‘ইসনস্’ (Esons)। 

একমাত্র সহকারী হিসেবে পান তার কর্মজীবনের সহযোদ্ধা, তার স্ত্রী মিসেস অনিতা চৌধুরীকে। ‘ইসনস্’ ছিল তার স্বপ্নের এক ক্ষুদ্র বীজ বপন, যা কঠোর পরিশ্রম ও প্রত্যয় দিয়ে অঙ্কুরিত হয়েছিল ‘স্কয়ার’ নামক বিশাল এক মহীরূহে। 

এরপর ১৯৫৮ সালে ১৭ হাজার টাকা পুঁজিতে তিনি তার তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্কয়ার’। এই নামের পেছনে ছিল এক গভীর দর্শন। ‘স্কয়ার’-এর চারটি বাহু যেমন চার বন্ধুকে বোঝাতো, তেমনি এটি ছিল পরিপূর্ণতা ও শুদ্ধতার প্রতীক। 

এ প্রসঙ্গে স্যামসন এইচ চৌধুরী সে সময় বলেছিলেন, ‘স্কয়ার মানেই পারফেকশন। এ জন্যই আমরা নাম রাখলাম স্কয়ার।’

14

প্রথম তিন বছর কোনো লাভ না হলেও তার অবিচল সাধনা স্কয়ারকে নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে। ১৯৮৫ সালে দেশের সব বহুজাতিক কোম্পানিকে পেছনে ফেলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস হয়ে ওঠে দেশসেরা এবং সেই অবস্থান আজও ধরে রেখেছে।

স্কয়ার আজ শুধু একটি নাম নয়, এটি পরিণত হয়েছে আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিশব্দে। আর এটি শুধু সম্ভব হয়েছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর অদম্য মনোবল ও উদ্ভাবনী ভাবনাকে পুঁজি করে নিজের বিশ্বাসে ছাড় না দিয়ে অনঢ় থাকার জন্য। 

ঔষধশিল্পে সাফল্যের পর স্যামসন এইচ চৌধুরী তার ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করেন। এরপর স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার টেক্সটাইলস, মিডিয়াকম লিমিটেড, এগ্রো-কেমিকেলস ও ভেটেরিনারি প্রোডাক্টস, স্কয়ার স্পিনিং, স্কয়ার নিট ফেব্রিক্স, স্কয়ার ফ্যাশনস, স্কয়ার কনজিউমার প্রোডাক্টস, স্কয়ার ইনফরম্যাটিক্স, স্কয়ার হসপিটালস ও মাছরাঙা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এভাবে একের পর এক নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেশের শিল্পখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।

13

সে কারণে স্যামসন এইচ চৌধুরীকে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আন্দোলনের প্রথম সারির একজন যোদ্ধা বলা হয়। তিনি মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে যেমন ভূমিকা রেখেছেন তেমনি স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার অবদান চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন একজন পাঞ্জেরী, তার সমসাময়িকদের কাছে তিনি ছিলেন একজন আইকন, তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছে ছিলেন একজন পরামর্শদাতা ও নিয়ন্ত্রকদের কাছে ছিলেন ন্যায্যতার এক বিস্ময়কর প্রতীক।

জীবদ্দশায় তিনি বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্বশীল পদে থেকে শিল্প-বাণিজ্য খাতের সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। 

আরও পড়ুন
Web-Image7

স্যামসন এইচ চৌধুরী: কাজই ছিল যার ভালোবাসা

স্যামসন এইচ চৌধুরী ঢাকা মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান (২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত), এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সহসভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

সমাজসেবায় এক অনন্য মানবিক ছিলেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। নীরবে মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। আত্মপ্রচার একেবারেই পছন্দ করতেন না। তিনি পাবনার অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি আধুনিকায়ন করেন, যা আজ সমৃদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি বনমালী শিল্পকলা কেন্দ্র, পাবনা প্রেস ক্লাবসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সহায়তা করেন। 

08

অসাধারণ সৌজন্যবোধ ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য তিনি ছিলেন সব মানুষের অতি প্রিয়ভাজন। তার চলনে-বলনে-কথনে ছিল মাধুর্য। তেমনি পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন। মানবিক গুণাবলি, সফল উদ্যোক্তা, কর্মীবান্ধব মনোভাব এক অনন্য উচ্চতায় স্থান করে নেন স্যামসন।

তিনি একুশে পদক, সর্বোচ্চ করদাতা, আমেরিকান চেম্বার কর্তৃক বিজনেস এক্সিকিউটিভ অব দ্য ইয়ারসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন। শিল্পোৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করে স্যামসন এইচ চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এজন্য তিনি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (সিআইপি) স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে স্যামুয়েল এস চৌধুরী (স্বপন চৌধুরী) বর্তমানে স্কয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান, মেজ ছেলে তপন চৌধুরী স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার হাসপাতাল ও স্কয়ার টেক্সটাইলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ছোট ছেলে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু মাছরাঙা টেলিভিশন, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একমাত্র মেয়ে রত্না পাত্র স্কয়ার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান।

32

কীর্তিমানদের মৃত্যু নেই। মৃত্যুঞ্জয়ী এই শিল্প ব্যক্তিত্ব জগতের স্বাভাবিক নিয়মে চলে গেছেন ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি। কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ ও মূল্যবোধের পথ ধরে আজ তার উত্তরসূরিরা এগিয়ে চলেছেন, এগিয়ে চলেছে স্কয়ার পরিবারের ৮১ হাজার সদস্য। যা প্রমাণ করে স্যামসন এইচ চৌধুরী তার কাজের মধ্য দিয়ে আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন। আলো ছড়াচ্ছেন বাতিঘর হয়ে।

জন্মশতবর্ষে স্যামসন এইচ চৌধুরীর অমর স্মৃতির প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। ওপারে ভালো থাকুন হে ক্ষণজন্মা।

আরটিভি/আইএম