সোমবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৫ , ০২:০০ পিএম
ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশে নিয়ম মেনে আবর্তিত হয় ঋতুচক্র। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর স্বস্তির বর্ষা, কোমল কাশফুলের ছোঁয়ায় আসে শরতের স্নিগ্ধতা, সোনালী ধান আর পিঠাপুলির হেমন্তের পর খেজুর গুড় আর ফুলের সম্ভার নিয়ে আসে কুয়াশাচ্ছন্ন শীত। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেন একটু ব্যতিক্রম। বর্ষার থৈ থৈ পানির রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কোমল কাশফুল আর প্রস্ফুটিত পদ্মের পরশে কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল দিতে শুরু করেছে শীতের আভাস।
সারাদেশে এখনও গ্রীষ্মের দাবদাহ আর বর্ষার অঝোর ধারায় নিমজ্জিত থাকলেও নান্দনিক সৌন্দর্যের আঁতুড়ঘর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হিমশীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রভাতের প্রস্ফুটিত শাপলার ওপর যেন নিবিড়ভাবে শুভ্র কুয়াশার প্রলেপ দিয়ে আচ্ছাদিত করে রেখেছে প্রকৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলো যেন এক অপার্থিব অসীম টানে শুভ্র শিশির কণাগুলোকে গ্রাস করে নিতে চাইছে। কাকডাকা ভোরে প্রাতঃভ্রমণে কুয়াশাচ্ছাদিত সড়কে যেন আপনা থেকেই মন গেয়ে ওঠে-
_20251006_135947530.jpeg)
কুয়াশার চাদরে শীত এসেছে
মৃদু হিমেল হাওয়া বহিয়া,
শীত এসেছে শিশির ফোটায়
ফুটেছে জেসমিন ডালিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অপার স্নেহে সংরক্ষিত ক্যাম্পাসের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন বছরজুড়ে শীতের আগমনকে বরণ করতে প্রস্তুত হয়। শীতের অপার সৌন্দর্যের মহিমায় উজ্জীবিত হয় এই লাল ইটের প্রাঙ্গণে। চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, জারবেরা আর গোলাপের সাজানো ডালি থেকে শুরু করে পাতলা চাদর গায়ে বৃদ্ধার প্রকম্পিত কনকনে শরীরে শীত পূর্ণতা পায় এই ক্যাম্পাসে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেন ঢাকা শহরের অদূরেই প্রাকৃতিক স্বাধীনতায় গড়ে ওঠা এক নান্দনিক গ্রাম। শীত ঢাকা শহরের কর্পোরেট মানুষদের জীবনের অনুভূতিকে হিমেল পরশে সম্মোহিত করতে না পারলেও জাহাঙ্গীরনগরে শীতের জুড়ি মেলা ভার। এই নগরে শীত তার হৃদয় নিংড়ানো মোহনীয়তায় ব্যাকুল করে সবাইকে।

যেসব উপকরণ জাবির শীতকে পূর্ণতা দেয় তার মধ্যে অন্যতম হল নদীর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এর লেকগুলো। বর্ষার পর থেকেই লেকগুলোতে চলে শাপলা শালুকের রাজত্ব। পদ্ম যেন রুপের পশরা সাজিয়ে শীতকে আহ্বান করে পরম আবেদনে। সাদা, লাল আর নীল শাপলা পত্র লেকের উপরিতলে শীতল বিছানা বিছিয়ে যেন শীতকে স্বাগত জানাচ্ছে। শীতে এই পদ্মশোভিত লেকগুলো অতিথি পাখির উপযুক্ত অভয়ারণ্য হিসেবে কাজ করে। অক্টোবরে শীতের শুরু থেকেই প্রতিবছর উত্তরের শীতপ্রধান দেশ সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, সিনচিয়াং ও ভারত থেকে হাজার হাজার অতিথি পাখি দক্ষিণ এশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশে আসা পাখিদের ৮-৯ শতাংশ কুয়াশার চাদর মুড়িয়ে এইক্যাম্পাসেই থিতু হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাস এখন অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হতে শুরু করেছে। উপযুক্ত পরিবেশ আর নিরাপদ আশ্রয়ে ক্যাম্পাসের পদ্মে শোভিত লেকগুলোতে এসব অতিথি পাখি মেতে উঠেছে জলকেলিতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকটি বড় জলাশয় আছে। এর মধ্যে পাখির আনাগোনা সবচেয়ে বেশি বন্যপ্রাণী গবেষণা ও সংরক্ষণ কেন্দ্র (WRC) এর জলাশয়ে। এছাড়াও প্রশাসনিক ভবনের সামনে ও পেছনের দুটি জলাশয়, জাহানারা ইমাম হল, প্রীতিলতা হল এবং আলবেরুনী হলসংলগ্ন জলাশয়ে। সব জলাশয়ে আছে লাল শাপলা। দিনের প্রথম ভাগে শাপলারা ফুটন্ত থাকে। লাল শাপলার এ গালিচার মধ্যে অতিথি পাখির জলকেলি যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের জন্ম দেয়। বর্তমানে ক্যাম্পাসের জলাশয়ে হাঁসপাখি ‘পাতি সরালি’র প্রাধান্যই বেশি। এ ছাড়া মাঝেমধ্যে দেখা মিলে ছোট পানকৌড়ি, ধলাবুক ডাহুক কিংবা পাতি পানমুরগিসহ প্রায় পঞ্চাশ প্রজাতির। তবে শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলাশয়গুলোতে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি সাধারণত বেড়ে থাকে।

শীত মানেই পিঠাপুলির উৎসব। গ্রাম বাংলার এ ঐতিহ্যবাহী এ আমেজ থেকে বঞ্চিত হয় না জাহাঙ্গীরনগরও। শীতের শুরু থেকেই রাস্তার দুই ধার দিয়ে বসে পিঠার মেলা। অস্থায়ী এ দোকানগুলোতে শীতের পিঠা সূলভ মূল্যে পেতে পারে শিক্ষার্থীরা। এ দোকানগুলোতে থাকে চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, পাটিসাপটা, নকশি পিঠা, তেল পিঠাসহ নানা পদের মুখোরোচক পিঠার সমোরহ।
শীতের অনবদ্য সৌন্দর্যে মুখরিত কুয়াশাচ্ছন্ন ক্যাম্পাসে সেন্ট্রাল ফিল্ড, টিএসসির ছাদ কিংবা মুক্তমঞ্চে শিক্ষার্থীরা বসায় গানের পশরা। শীতের কুয়াশা, পিঠাপুলি, অতিথি পাখি আর পদ্ম-শাপলার মিশেলে একটি সম্মোহিত নৈসর্গীক পরিবেশে পরিণত হয় জাহাঙ্গীরনগর।
আরটিভি/এমএ