বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ , ০৩:৪১ পিএম
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ৩ জুন। ২০০৭ সালের ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দিনকে স্মরণীয় রাখতেই প্রতিবছর এ দিনে পালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।
দীর্ঘ দুই দশকের পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র একবার। ২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সেই সমাবর্তনে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত মোট পাঁচটি ব্যাচের ১ হাজার ৩৯৯ জন গ্র্যাজুয়েট অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় ২৯ জন শিক্ষার্থীকে মোট ৩২টি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।
তবে সেই সমাবর্তনের পর ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কোনো সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়নি। ফলে ডিগ্রি সম্পন্ন করা হাজারো শিক্ষার্থী এখনও তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০১৭ সালের সেই সমাবর্তনের দিনটি ছিল নজরুল চেতনায় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় আয়োজন। তবে এরপর থেকে নতুন কোনো সমাবর্তন না হওয়ায়, একের পর এক একাডেমিক ব্যাচ পাস করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও একমাত্র সমাবর্তনও সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না। সমাবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের সনদপত্রে বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি নিয়ে অভিযোগ ওঠে। পরে সংশোধিত সনদপত্র প্রদান করা হলেও তা নিয়েও অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে নতুন নকশার ‘এক পাতার দুই পাশে’ মুদ্রিত সনদপত্র নিয়ে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফলে সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও সনদপত্রের মান ও উপস্থাপন নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকে যায়।
এই দীর্ঘ বিরতিতে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। অনেকেই মনে করছেন, ডিগ্রির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা রয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির চৌধুরী বলেন, ‘সমাবর্তন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ছাত্রজীবনের সোনালি স্মৃতিকে ফিরে দেখার এক আবেগঘন মুহূর্ত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ তম ব্যাচ চলছে, অথচ এতদিনে মাত্র একবার সমাবর্তন হয়েছে, যা ৫ম ব্যাচ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী অনেক ব্যাচ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও সমাবর্তনের স্বাদ পায়নি- এটা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক ও লজ্জার বিষয়। সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের আকুল আবেদন, ২০২৬ সালেই দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করে হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণে প্রশাসন দায়িত্ব পালন করুক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এইচ. আই. হাবিব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন ২০ তম ব্যাচও প্রায় চলে এসেছে, কিন্তু একটি মাত্র সমাবর্তন হয়েছে এ পর্যন্ত। সমাবর্তন না হওয়ার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে ওঠতে যা প্রয়োজন, সেসবের কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং সাবেক শিক্ষার্থীরা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, কোনো অ্যালামনাই গঠন করা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না এই বিচ্ছিন্নতার কারণে। সমাবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত সনদ প্রদান করা হয়, কিন্তু সমাবর্তন না হওয়ায় শিক্ষাজীবনের সেরা অর্জন সেই সনদও পেতে পারছি না আমরা।’
ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘সমাবর্তন একজন শিক্ষার্থীর আবেগের জায়গা—সেটা আমিও অনুভব করি। কিন্তু সমাবর্তনের মতো একটা অনুষ্ঠান হঠাৎ করেই আয়োজন করা সম্ভব হয় না, এর জন্য প্রয়োজন পূর্ব-পরিকল্পনা। এর সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটসহ আরও অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০২৩ সালে একটি সমাবর্তনের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিলেও পরবর্তীতে নির্বাচন ইস্যুতে দেশের অবস্থা অস্থিতিশীল হওয়ার কারণে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান জানান, 'সমাবর্তনের মতো বৃহৎ আয়োজন সম্পন্ন করতে সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-এর কাছে বাজেট বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছি। একই সঙ্গে নতুন সরকারের দায়িত্বগ্রহণের প্রেক্ষাপটে সার্বিক বিষয়গুলো গুছিয়ে নিয়ে এগোতে চাই।
মূল সনদ উত্তোলনের বিষয়ে তিনি জানান, ‘কোনো শিক্ষার্থী চাইলে বিশেষ বিবেচনায় তার মূল সনদ উত্তোলন করতে পারবে।’
উল্লেখ্য, সমাবর্তন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর এই আয়োজন করা হয় এবং এতে উপাচার্য, চ্যান্সেলরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক পোশাক (গাউন ও ক্যাপ) পরে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
লেখক: সদস্য, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব
আরটিভি/এসএস