images

ক্যাম্পাস

গবিতে পরীক্ষা স্থগিত হলেও ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৮:৫৯ এএম

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংকটময় পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) চলতি সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। একই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে অন্যান্য সেশনের শিক্ষার্থীদেরও। ক্লাসে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে যেতে হচ্ছে তাদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে চলমান জানুয়ারি-জুন সেশনের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার ১২ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারিত সব পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে অন্যান্য সেশনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তি নিরসনে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের বরাতে জানা গেছে, সাভার পৌর এলাকা, আশুলিয়ার জামগড়া, ভাদাইল, বাইপাইল, গাজীপুর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতি বর্ষাতেই একই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিনেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। অনেক এলাকায় পানি পেরিয়ে মূল সড়কে উঠতে হচ্ছে, যা দুর্ভোগের অন্যতম কারণ। কোথাও কোথাও গণপরিবহনও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে না।

ভোগান্তি ঠেলে কর্মস্থলে আসার বিষয়ে ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া আহমেদ তন্বী বলেন, ‘আমার বাসার সামনের রাস্তার সংস্কারকাজ চলমান থাকায় গতকালের অতিবৃষ্টিতে রাস্তাজুড়ে হাঁটুসমান পানি জমেছে। পানি ভেঙে বড় রাস্তায় গিয়ে অনেক কষ্টে একটি রিকশা পেয়েছিলাম। পাকিজা মোড়েও হাঁটুসমান পানি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত, আবার ২০ মাইল এলাকায়ও হাঁটুসমান পানি। গাড়ি রাস্তায় অর্ধেক ডুবে যায়, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। তারপরও আমাদের যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে অন্তত দুই দিনের জন্য ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ভোগান্তি হচ্ছে, কিন্তু এভাবেই যেতে হচ্ছে।

কৃষি অনুষদের সিনিয়র প্রভাষক লাবণী ইয়াসমিন বলেন, বৃষ্টির দিনে জলাবদ্ধতার কারণে সকালে ক্যাম্পাসের বাস ধরা এবং নিয়মিত যাতায়াত করা আমাদের সবার জন্যই চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস মিস হয়ে গেলে জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় কোনো গাড়ি পাওয়ারও উপায় থাকে না। যেসব দিনে পরীক্ষা থাকবে না, সেসব দিনে অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে শিক্ষার্থীদের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পড়াশোনার ক্ষতি হবে না। একই সঙ্গে ভোগান্তিও কমবে।

আইন বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, আমরা যারা মানিকগঞ্জ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করি, তাদের প্রতিদিনের যাত্রাপথ এমনিতেই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর। এর মধ্যে বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় হাঁটুসমান পানি জমে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নোংরা পানির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে আমাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে। ফলে সময়মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ভোগান্তির বিষয়ে ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস অনুষদের নবম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. সাঈদ হাসান বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত হলেও অক্টোবর সেশনের সব ক্লাস নিয়মিত চলছে। ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা হাঁটুপানি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসে আসছেন। অতিরিক্ত পানির কারণে এনায়েতপুরের ফকিরবাড়ী মোড়ে রিকশা থেমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে যেতে না পারে, তাহলে ক্লাসের জন্য কীভাবে যাবে? একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা স্থগিত হয়, কিন্তু ক্লাস চলমান থাকে। বিষয়টি সবার কাছেই বেমানান মনে হয়।

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান বলেন, বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসতে পারবে না, তারা কোর্স শিক্ষককে জানালে পরবর্তী সময়ে ক্লাস করার সুযোগ পাবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যা বিবেচনা করে চলমান সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী ওহিদ্দুজামান জানান, দেশের বর্তমান বৈরী আবহাওয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আপাতত চলমান সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ক্লাসের বিষয়ে বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা ক্লাস নেবেন কি না, সেটি তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে উপস্থিতির বিষয়ে এখনো কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুই-এক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এড়িয়ে সাময়িকভাবে ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু করে জরুরি প্রশাসনিক কাজ অনলাইনে পরিচালনা করা সম্ভব কি না—এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস বন্ধ রাখার কোনো নিয়ম নেই। এখনো পর্যন্ত অফিস বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমাদের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রয়েছে। তারা গাড়িতে করে আসবেন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেউ সমস্যায় পড়লে বা আসতে না পারলে আবেদন করবেন। আমরা বিষয়টি বিবেচনা করব।

তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা ও ক্লাস দুটি ভিন্ন বিষয়। কেউ যদি ভিজে ভিজে পরীক্ষা দিতে আসে, তাহলে টানা তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই আমরা আপাতত পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ক্লাসের বিষয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের কোর্স শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে ক্লাস স্থগিতের আবেদন করতে পারে। এতে প্রশাসনের কোনো আপত্তি নেই।

আরটিভি/টিআর