মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ০৯:০৫ এএম
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বছরে একবার দানার জন্য ভুট্টা চাষের পরিবর্তে পশুখাদ্য হিসেবে বছরে দুইবার ভুট্টা ঘাস চাষ করলে কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে সারা বছর গবাদিপশুর খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি মৌসুমি বন্যাকালীন সময়ে জীবিকা নির্বাহ সহজ হয় এবং গবাদিপশু পালন আরও টেকসই হয়। বর্ষাকালে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা জলমগ্ন অবস্থায় পশুখাদ্যের তীব্র সংকট মোকাবিলায়ও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এমনটাই জানিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনিমেল নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম।
তিনি জানান, হাওর বাস্তুতন্ত্র প্রায় ২০ লাখ হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, যা বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ শতাংশ। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এই অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে থাকায় গবাদিপশু তীব্র খাদ্যসংকটে পড়ে। পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে কৃষকেরা অনেক সময় কম বয়সেই গবাদিপশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। ফলে পারিবারিক আয় ও গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা—উভয়ই হ্রাস পায়।
এমতাবস্থায় কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) গবেষণা অনুদানের আওতায় পশুখাদ্য সংরক্ষণের একটি টেকসই প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের গবেষণার পর এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বছরে দুইবার ভুট্টা ঘাস উৎপাদন এবং সাইলেজ (সংরক্ষিত পশুখাদ্য) তৈরির ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। দানার জন্য ভুট্টা সংগ্রহের পরিবর্তে কৃষকেরা শুষ্ক মৌসুমে দুইবার সম্পূর্ণ ভুট্টাগাছ সবুজ ঘাস হিসেবে চাষ করেন এবং বর্ষাকালে গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য তা সাইলেজ হিসেবে সংরক্ষণ করেন।
এই দ্বৈত-চক্র ভুট্টা ঘাস উৎপাদন পদ্ধতির ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এতে প্রতি একরে প্রায় ৩২ দশমিক ৭ টন বায়োমাস উৎপাদিত হয়েছে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আট গুণেরও বেশি। যদিও এ পদ্ধতিতে উৎপাদন ব্যয় কিছুটা বেশি, তবু শুধুমাত্র দানার জন্য ভুট্টা উৎপাদনের তুলনায় এতে চার গুণেরও বেশি মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংরক্ষিত ভুট্টার সাইলেজ দুগ্ধবতী গরুর জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে খাওয়ানোর মাধ্যমে দেখা গেছে, সাইলেজ ব্যবহারের ফলে বন্যা মৌসুমে গরুর দৈহিক ওজন হ্রাস রোধের পাশাপাশি দৈনিক গড় দুধ উৎপাদন প্রতি গরুতে ৩ দশমিক ৭ লিটার থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৫৮ লিটারে উন্নীত হয়েছে। গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, হাওর অঞ্চলে গবাদিপশুর প্রচলিত খাদ্য ধানের খড়ের তুলনায় ভুট্টার সাইলেজ অনেক বেশি প্রোটিন ও শক্তি সরবরাহ করে।
ড. সাইফুল জানান, কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর, মহিষারকান্দি ও উরিঅন্দ গ্রামের তিন শতাধিক কৃষক এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেন। যদিও শুরুতে কৃষকদের কাছে সাইলেজ তৈরির বিষয়টি অপরিচিত ছিল, তবু বর্ষাকালে গবাদিপশুর উন্নত স্বাস্থ্য, অধিক দুধ উৎপাদন এবং খাদ্যসংকট কমে যাওয়ার সুফল প্রত্যক্ষ করার পর তারা দ্রুত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, সাইলেজের এই ধারণা হাওর অঞ্চলে ভুট্টা চাষবিষয়ক প্রচলিত চিন্তাধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। শুধুমাত্র ভুট্টার দানার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে কৃষকেরা সম্পূর্ণ ফসলকে উচ্চমানের সাইলেজে রূপান্তর করতে পারেন। এর ফলে বন্যা মৌসুমে গবাদিপশুর জন্য নিরবচ্ছিন্ন খাদ্যের নিশ্চয়তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক মুনাফাও অর্জন করা সম্ভব। ফসল ও গবাদিপশুর সমন্বিত এই পদ্ধতি হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
তবে গবেষকের মতে, কৃষকদের সচেতনতার অভাব, সাইলেজ তৈরির যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, উন্নত মানের ভুট্টার বীজের ঘাটতি, সংরক্ষণ উপকরণের অভাব, ঋণপ্রাপ্তির সীমিত সুযোগ এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার দুর্বলতা এই প্রযুক্তি বিস্তারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
জানা গেছে, কেজিএফের অর্থায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শুরু হয়। এতে প্রধান গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম। পাশাপাশি কেজিএফের একটি কারিগরি দল প্রকল্পটি নিবিড়ভাবে তদারকি করছে। দলটিতে রয়েছেন নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. নাথু রাম সরকার, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সম্পদ) ড. মো. মনোয়ার করিম খান, জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (উদ্যান ফসল) ড. এম. নাজিরুল ইসলাম এবং জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ (প্রাণিসম্পদ) ড. মো. এরশাদউজ্জামান।
সম্প্রতি তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাইলেজ তৈরি ও ব্যবহারের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং হাওর অঞ্চলে এ প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে উৎসাহ প্রদান করেন।
গবেষকেরা মনে করেন, এটি কেবল একটি নতুন শস্য উৎপাদন পদ্ধতি নয়; বরং বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ হাওর এলাকায় শস্য উৎপাদন ও গবাদিপশু পালনকে সমন্বিত করার একটি সম্ভাবনাময় জীবিকা কৌশল। সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত সহায়তায় এ প্রযুক্তি দেশের বন্যাপ্রবণ জলাভূমি এলাকায় টেকসই কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
আরটিভি/টিআর