বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ , ১২:৩১ পিএম
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তাল হয়ে ওঠে। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ মাঠে নামে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের হুমকি, বাধা ও হামলার অভিযোগ ওঠে। তবে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিতে সক্ষম হন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও তৎকালীন সমন্বয়কারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৬ জুলাই ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো দিন। সেদিন আন্দোলনকারীদের কর্মসূচি ছিল দুপুর আড়াইটায়। একই স্থানে এক ঘণ্টা পর ছাত্রলীগও জমায়েতের ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্দোলনকারীরা গোপনে কর্মসূচির সময় এগিয়ে এনে আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানান।
দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকা থেকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে প্রধান ফটক দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। সেখানে শতাধিক পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা বাধা দেননি। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের অনেকের হাতে রড, লাঠি ও পাইপ ছিল।
মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা দলে দলে বেরিয়ে আসেন। প্যারিস রোডে পৌঁছালে আরও কয়েকশ শিক্ষার্থী মিছিলে যোগ দেন। পরে মেয়েদের হলের সামনে প্রায় দেড় হাজার ছাত্রী মিছিলে অংশ নেন। এরপর মিছিলটি বিজ্ঞান ভবনের পাশ দিয়ে হবিবুর রহমান হল মাঠ হয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে গেলে সেখানে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তারা পিছু হটে মাদার বখ্শ হলের দিকে চলে যান।
এদিকে শাহ মখদুম, লতিফ ও আমীর আলী হল থেকেও শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল গালিবকে ধাওয়া দেন। তিনি মোটরসাইকেলে করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। পরে তার কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। গালিবের ক্যাম্পাস ছাড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর বিজয় ২৪ হলের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কক্ষেও ভাঙচুর করা হয়। এ সময় পুলিশ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, তার কক্ষ ও দপ্তর সেল থেকে তিনটি পিস্তল, ছয়টি রামদা, ১০ থেকে ১৫টি মদের বোতল, কয়েকটি দা ও রড উদ্ধার করে পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক মেহেদী সজীব আরটিভিকে বলেন, ১৬ জুলাই আমরা ছাত্রলীগকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিতাড়িত করি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য ক্যাম্পাসেও একই ঘটনা ঘটে। আমাদের এই কর্মসূচিই ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি তৈরি করে।
আরেক সাবেক সমন্বয়ক মেশকাত মিশু আরটিভিকে বলেন, ছাত্রলীগ আন্দোলন ঠেকাতে একই স্থানে কর্মসূচি দেয়, বিভিন্ন হলে নজরদারি বসায় এবং কয়েকটি হলে তালাও লাগিয়ে দেয়। এরপরও শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি জানান, মাদার বখ্শ হলের সামনে তিনি নিজেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান দেখেছিলেন। পরে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ধাওয়ায় তারা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন।
সাবেক সমন্বয়ক ফাহিম রেজা আরটিভিকে বলেন, ১৫ জুলাই রাতেই আন্দোলনের পরিকল্পনা করা হয়। শিক্ষার্থীরা ছেলেদের হল, মেয়েদের হল এবং বিনোদপুরে আলাদা অবস্থান নেন। পরে ছাত্রলীগ হামলার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে বিভিন্ন হল দখলমুক্ত করেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের প্রভাবের অবসান ঘটানোর ঘটনাই পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের গতি বাড়ায় এবং ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পথ আরও সুগম করে।
আরটিভি/জেএমএ