বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ , ০৫:০৮ পিএম
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান জিমনেশিয়ামে পুনরায় বড় পর্দায় বিশ্বকাপ খেলা প্রদর্শনের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে সেখানে খেলা প্রদর্শন করেন একদল শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অভ্যন্তরীণ সড়কে নিজ উদ্যোগে খেলা প্রদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষা, প্রশাসনিক ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত করা এবং কর্মঘণ্টা নষ্টের অভিযোগে ১০ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এটি ছিল একটি ন্যায্য দাবি উপস্থাপনের কর্মসূচি, কোনো অপরাধ নয়। এছাড়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও কয়েকজন শিক্ষার্থী কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, গত ৭ জুলাই জিমনেশিয়ামে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। এরপর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিমনেশিয়ামের পরিবর্তে বিভিন্ন আবাসিক হলে খেলা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। তবে এ সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি ছিল, আগের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়ামে বড় পর্দায় একসঙ্গে বিশ্বকাপ খেলা দেখার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা।
এর ধারাবাহিকতায় গত শনিবার (১২ জুলাই) সকালে একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক বন্ধ করে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সড়কে বড় পর্দায় আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের খেলা প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আনতে বা নিয়ে যেতে কোনো বাস চলাচল করতে পারেনি। একই সঙ্গে বাইরের কোনো যানবাহনও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে পৃথকভাবে ১০ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রধান ফটক বন্ধ করে খেলা প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ও বের হতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব কার্যক্রম, প্রথম বর্ষের ভর্তি কার্যক্রমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও নোটিশে দাবি করা হয়। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের Rules of Discipline for Students অনুযায়ী কেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে সাত দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া যবিপ্রবির শিক্ষার্থী শেখ আবু সুফিয়ান বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি উপস্থাপন করা কোনো অপরাধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্থান। আমি বিশ্বাস করি, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে নয়। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরকে দমন করে এবং গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা না করা কখনোই কোনো প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। আর এটাই যদি প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য হয়, তাহলে তা স্বৈরাচারী প্রশাসনের পরিচয় বহন করে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাই।
আরেক শিক্ষার্থী রাকিব হাসান সিহাব বলেন, আমাদের একটাই দাবি ছিল—বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য জিমনেশিয়ামে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা। গুটিকয়েক শিক্ষার্থীর কারণে পুরো শিক্ষার্থী সমাজকে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছি এবং স্মারকলিপিও দিয়েছি। কিন্তু আমাদের যৌক্তিক দাবির কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি পালন করতে বাধ্য হয়েছে। দুঃখজনকভাবে, অধিকার চেয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করায় শিক্ষার্থীদের অপরাধীর মতো বিবেচনা করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতে, সংলাপের পরিবর্তে এ ধরনের পদক্ষেপ কোনো শক্তির পরিচয় নয়; বরং পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুর্বলতা, অদূরদর্শিতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
অন্য এক শিক্ষার্থী সামিউল বলেন, আমি সেদিন সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। আমার সব বক্তব্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তুলে ধরব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, খেলা প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জিমনেশিয়ামে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলগুলোর অভ্যন্তরে খেলা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। কিন্তু একদল শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে মূল ফটক বন্ধ করে নিজ উদ্যোগে সেখানে খেলা প্রদর্শন করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আনার জন্য কোনো বাস ছেড়ে যেতে পারেনি, আবার বাইরের বাসও ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যেকোনো যৌক্তিক দাবির পক্ষে আমরা আছি। তারা যদি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা শিক্ষার্থীদের নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ ঘটনায় একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করেছিল। যারা স্বশরীরে সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, তাদের কেউ কেউ অন্যভাবে এ ঘটনায় পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন—এমন প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। সে কারণেই তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
আরটিভি/টিআর