শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ , ০৩:৫০ পিএম
শিক্ষা, গবেষণা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের গৌরবময় ধারক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং দেশের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা রেখেছেন সাহসী ভূমিকা।
প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তার পদচারণায় মুখর সবুজের মতিহার ক্যাম্পাস দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শনও সমৃদ্ধ করেছে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য শহীদ মিনার কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় মসজিদ, জোহা চত্বর, 'সাবাশ বাংলাদেশ' ভাস্কর্য, সুবর্ণজয়ন্তী টাওয়ার, বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর এবং কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। প্রতিদিন এসব স্থাপনা দেখতে ভিড় করেন দেশ-বিদেশের দর্শনার্থী ও ভ্রমণপিপাসুরা।
শহীদ মিনার কমপ্লেক্স
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা শহীদ মিনার কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা, দুটি মুরাল ও একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও জাতীয় দিবস পালনের কেন্দ্র। শহীদ মিনারের পাশেই অবস্থিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভবন।
কেন্দ্রীয় মসজিদ
শহীদ মিনার কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন কেন্দ্রীয় মসজিদটি মোঘল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। নান্দনিক নকশা ও বিশাল পরিসরের কারণে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। প্রতিদিন হাজারো মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন।
জোহা চত্বর
জোহা চত্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও প্রতীকী স্থানগুলোর একটি। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহীদ হন অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। তিনি বাংলাদেশের প্রথম শহীদ শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃত। তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে এই চত্বরের নামকরণ করা হয়েছে।
বর্তমানে জোহা চত্বর শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা, প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও বিভিন্ন গণআন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত।
সাবাশ বাংলাদেশ ভাস্কর্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য 'সাবাশ বাংলাদেশ'। প্রখ্যাত ভাস্কর নিতুন কুণ্ডুর নকশায় নির্মিত এ ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয় ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি।
মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া দুই তরুণের প্রতিকৃতির মাধ্যমে সংগ্রামী বাঙালির আত্মত্যাগকে তুলে ধরা হয়েছে। ভাস্কর্যের দুই পাশে গ্রামীণ সংস্কৃতি, স্বাধীনতার আনন্দ এবং বিজয়ের প্রতীকী চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর সামনে রয়েছে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ।
সুবর্ণজয়ন্তী টাওয়ার
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৩ সালে নির্মাণ করা হয় সুবর্ণজয়ন্তী টাওয়ার। প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থিত ৩৫ ফুট উচ্চতার স্টিল নির্মিত এ ভাস্কর্যটি রাজশাহীর প্রখ্যাত ভাস্কর মৃণাল হকের নকশায় নির্মিত।
নান্দনিক এই স্থাপনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর সৌন্দর্য কিছুটা ম্লান হয়ে পড়েছে।
বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ
শহীদ শামসুজ্জোহা হলের অদূরে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতি বহন করে। ১৯৭২ সালের ২৩ এপ্রিল এখানে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, এ স্থানে প্রায় তিন থেকে চার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
৪২ ফুট উচ্চতার ছয় স্তরবিশিষ্ট স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশে রয়েছে গোলাকার বেদি এবং মাঝখানে একটি কূপ, যা প্রতীকীভাবে 'মৃত্যুকূপ' হিসেবে পরিচিত। স্তম্ভের বিভিন্ন নকশায় শহীদদের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা তুলে ধরা হয়েছে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিফলক।
এখানে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের প্রথম শহীদ শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহার আত্মত্যাগসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতীকী চিত্র খোদাই করা হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিকৃতিও সংযোজন করা হয়েছে।
শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে অবস্থিত শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাদুঘর।
এখানে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের দুর্লভ দলিল, আলোকচিত্র, পোস্টার, পোশাক, ব্যবহৃত সামগ্রী, ঐতিহাসিক নথি এবং শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষিত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে এটি গবেষক ও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর
রাজশাহী শহরে অবস্থিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর। ১৯১০ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
এখানে প্রায় নয় হাজারের বেশি প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতা, মহেঞ্জোদারো সভ্যতা, পাল ও সেন যুগ, গুপ্ত যুগ, মুসলিম শাসনামলসহ বিভিন্ন সময়ের ভাস্কর্য, মুদ্রা, পাণ্ডুলিপি, শিলালিপি ও দুর্লভ প্রত্নবস্তু দর্শনার্থীদের ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি দেশের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একাডেমিক ভবনের পূর্ব পাশে অবস্থিত এই গ্রন্থাগারে বিপুলসংখ্যক বই, গবেষণাপত্র, সাময়িকী ও জার্নাল সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে লাইব্রেরিটি। এখানে রয়েছে রেফারেন্স শাখা, জার্নাল বিভাগ, সাধারণ পাঠকক্ষ ও বিজ্ঞান পাঠকক্ষসহ প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর একসঙ্গে বসে পড়াশোনার ব্যবস্থা।
শিক্ষা, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও অমূল্য সম্পদ। প্রতিদিন এসব স্থাপনা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী ও ভ্রমণপিপাসীদের পদচারণায় মুখর থাকে সবুজের মতিহার ক্যাম্পাস।
আরটিভি/জেএমএ