মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ০৯:০৯ পিএম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হলেও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর জুলাই মাসজুড়ে গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে 'মসজিদ ও মন্দিরে শহিদদের স্মরণে বিশেষ দোয়া, জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবিতে গণ-স্বাক্ষর, অভ্যুত্থানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শন, কালো ব্যাজ ধারণ, শহিদ পরিবারগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ, কবর জিয়ারত, জুলাই ৩৬ কর্নার উদ্বোধন, গ্রাফিতি অঙ্কন ও চিত্রাঙ্কন' কর্মসূচি সহ নানা আয়োজন হলেও এবার শহিদদের স্মরণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ কিংবা কোনো প্রস্তুতিমূলক সভাও করা হয়নি।
এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে দেশব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে ছিল স্মরণসভা, সমাবেশ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলেও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিকভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ আন্দোলনে দেশের আপামর জনতা রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে। এ আন্দোলনে দেশের অনেক মানুষ আহত ও নিহত হন। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীরবতা ও উদ্যোগহীনতা নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে যথাযথ মর্যাদায় স্মরণ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব। তাই প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতা হতাশাজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই স্মরণে কোনো কর্মসূচি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থী ঐশ্বর্য হৃদয় বলেন, ‘জুলাই শুধু একটি মাস নয়, এটি ধারণ করার বিষয়। এটি জোর করে পালন করার বিষয়ও নয়। জুলাইয়ের প্রকৃত অংশীদার সাধারণ মানুষ। তাই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং জুলাই শহিদদের স্মরণে যথাযথ কর্মসূচির আয়োজন করা জরুরি। এমন আয়োজন হওয়া উচিত, যাতে শহিদদের প্রতি সম্মান জানানো যায় এবং গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও মানুষের প্রত্যাশা তুলে ধরা সম্ভব হয়। কিন্তু আমরা দেখছি, যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন, সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই জুলাইকে স্মরণ করে প্রশাসনের কোনো আয়োজন নেই, যা হতাশাজনক। আমি আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত জুলাই স্মরণে কর্মসূচি ঘোষণা করবে এবং এমন আয়োজন করবে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে জানতে ও এর চেতনা ধারণ করতে পারবে।’
লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. অলি উল্লাহ বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল এ বছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে জাঁকজমকপূর্ণভাবে জুলাই উদ্যাপন করা হবে এবং জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় দৃঢ় ভূমিকা রাখবে। জুলাই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং তরুণরাই ছিলেন এ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। জুলাই উদ্যাপনের মাধ্যমে আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কী করতে পারি, তা আলোচনার মাধ্যমে উঠে আসা দরকার ছিল। গত বছরও সরকারি কোনো বাজেট না থাকলেও আমরা জুলাই পালন করেছি। এবারও জুলাই উপলক্ষে আয়োজনের জন্য এখনো কোনো বাজেট দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকার বরাদ্দ দিক বা না দিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ উদ্যোগে জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভার আয়োজন করা উচিত ছিল। নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের চেতনা পৌঁছে দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয় যখন এ কাজ করবে না, তখন রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিজেদের মতো করে ব্যবহার করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হচ্ছে জুলাইয়ের ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং তা সঠিকভাবে তুলে ধরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব উদ্যোগ না থাকাটা খুবই হতাশাজনক।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, কেন্দ্র থেকে এখনো আমাদের কোনো নির্দেশনা আসেনি, গতবছর আমাদের মাসব্যাপী পালন করার নির্দেশনা ছিলো। আমরা প্রস্তুত আছি নির্দেশনা পেলেই আয়োজন করবো।
তবে গত সোমবার (১৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) নিজ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে।
আরটিভি/ এসকেডি