বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ০৯:৫১ এএম
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে শুরু থেকেই পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শত শত নারী শিক্ষার্থীও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কেউ মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন, কেউ আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন, আবার কেউ হলের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে রাজপথে নেমেছেন। ইন্টারনেট বন্ধ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও অনেকেই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও রাবির নারী শিক্ষার্থীদের সাহস, ত্যাগ ও নেতৃত্বের নানা দিক আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্দোলনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও সেই অভিজ্ঞতার অনেকটাই এখনো পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ হয়নি।
আন্দোলনের শুরুর দিকে অনেক নারী শিক্ষার্থী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও সহিংসতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সংগঠিতভাবে আন্দোলনে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল, জুলাই-৩৬ হল (তৎকালীন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল), মন্নুজান হল, বেগম খালেদা জিয়া হলসহ ছয়টি ছাত্রী হল থেকে শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও নানা বাধা সত্ত্বেও তারা রাজপথে অবস্থান নেন।
একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং হল ছাড়ার নির্দেশ দিলে নারী শিক্ষার্থীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। অনেকেই তাৎক্ষণিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারেননি। ট্রেন-বাস চলাচলে বিঘ্ন, ইন্টারনেট বন্ধ এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অনেককে রাজশাহীতেই আটকে থাকতে হয়। পরে তারা বিভিন্ন মেস, পরিচিতজন বা সহপাঠীদের বাসায় আশ্রয় নেন। তবে মেসে পুলিশি তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেখানেও অনিরাপত্তা তৈরি হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে সক্ষম হন। পরে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করেও ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানান তারা।
আন্দোলনে শুধু অংশগ্রহণ নয়, ব্যানার তৈরি, কর্মসূচির সমন্বয়, আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সহপাঠীদের সহায়তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নারী শিক্ষার্থীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাতের মুহূর্তেও তারা পিছু হটেননি; বরং সহপাঠীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে মানববর্ম তৈরি করেছিলেন।
জুলাই আন্দোলনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক পরিষদের অন্যতম নারী সদস্য তাসিন খান বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর আমি সমন্বয়ক পরিষদে যুক্ত হই। তখন মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম—স্বাভাবিক জীবনে হয়তো আর ফেরা হবে না। মনে হয়েছিল, বেঁচে থাকলেও হয়তো জেলে যেতে হবে কিংবা পলাতক জীবন কাটাতে হবে। ৫ আগস্টের পরের জীবনকে আমি বোনাস জীবন মনে করি। জুলাই আমাকে বিবেকের গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করিয়েছে। আন্দোলনের পর আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছি। বিভিন্ন সুযোগ এলেও কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। রাজনীতিসচেতন নাগরিক হিসেবে থাকতে চাই এবং দলান্ধতাকে সবসময় প্রত্যাখ্যান করি।"
তিনি আরও বলেন, "জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও সেই সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোর একটি। ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাহস, ঐক্য ও দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।"
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া আরেক নারী শিক্ষার্থী এবং রাকসুর মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সাইয়েদা হাফসা বলেন, "কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল একটি যৌক্তিক আন্দোলন। তাই শুরু থেকেই আমরা এর সঙ্গে ছিলাম। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা ৭ জুলাই থেকেই অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সব হল থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যুক্ত হন।"
তিনি বলেন, "১৪ জুলাই রাতে বেগম খালেদা জিয়া হলের ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে বেরিয়ে মিছিলে যোগ দেন। অন্য হলের ছাত্রীরাও একইভাবে আন্দোলনে অংশ নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। কেউ লাঠি, কেউ মরিচের গুঁড়া, আবার কেউ বেডের স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে আন্দোলনে নেমে পড়েন।"
হাফসা আরও বলেন, "১৬ জুলাই সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের বিস্ফোরণের শব্দ এবং গ্যাসের প্রভাব মেয়েদের হল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একই সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসছে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরদিন অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছাড়লেও কিছু সাহসী ছাত্রী শেষ পর্যন্ত হল না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। পরে প্রশাসনের নির্দেশে তাদেরও হল ছাড়তে হয়।"
মন্নুজান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও বর্তমান হল সংসদের সহসভাপতি সুমাইয়া জাহান বলেন, "আন্দোলনের শুরু থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। প্রথমদিকে ছোট ছোট দলে কর্মসূচিতে অংশ নিলেও আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হল থেকে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মন্নুজান হলের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, বরং ন্যায্য দাবির পক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আন্দোলনে নেমেছিলেন।"
তিনি আরও বলেন, "টিয়ারশেল, হামলা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকলেও নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের স্থান ত্যাগ করেননি। হল ছাড়ার দিনটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। পরিবহন সংকট, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে অনেকেই নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেননি। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা সাহস, সংহতি ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন।"
লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাঈম তুহিনা বলেন, "নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বলব, জুলাইকে শুধু একটি স্মৃতি হিসেবে নয়, শিক্ষা হিসেবে ধারণ করতে হবে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। সেই চেতনা ধরে রেখে এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস তখনই পূর্ণতা পায়, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার অবদান সমান গুরুত্বে নথিবদ্ধ করা হয়। শুধু নেতৃত্বের গল্প নয়, সাধারণ নারী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাই রাবির জুলাই আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিয়ে মৌখিক ইতিহাস, সাক্ষাৎকার ও তথ্যভিত্তিক গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে অংশ নেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, "জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীরা সম্মুখসারির সংগঠক ও অংশগ্রহণকারী হিসেবে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছেন। তারা শুধু সমর্থনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, স্লোগানে আন্দোলনকে বেগবান করেছেন, আহতদের চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন এবং খাদ্য ও মানবিক সহায়তা দিয়েছেন। এমনকি গ্রেপ্তার সহযোদ্ধাকে ছাড়িয়ে আনা ও আহতদের সেবাতেও তারা এগিয়ে গেছেন।"
তিনি বলেন, "তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি এখনো অপ্রতুল। আন্দোলনে তাদের অবদানও অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।"
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি সাহস, ত্যাগ, প্রতিরোধ ও মানবিকতারও ইতিহাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা সেই ইতিহাসে শুধু সহযাত্রী ছিলেন না, বরং অনেক ক্ষেত্রেই ছিলেন সামনের সারির অংশগ্রহণকারী। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাদের অভিজ্ঞতা ও অবদান যত বেশি নথিবদ্ধ হবে, ততই সমৃদ্ধ ও পূর্ণতা পাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস।
আরটিভি/জেএমএ