সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ০৬:২৫ পিএম
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিজয়-২৪ হলের অভিযুক্ত ক্যান্টিন কর্মীর শাস্তি নিশ্চিতসহ শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত তিন দফা দাবি বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ হওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে ফিরতে নারাজ তারা।
গত ২২ জুলাই রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে বিজয়-২৪ হলের মেয়েদের ওয়াশরুমে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় গোপনে ভিডিও ধারণের সময় ইমাম হাসান নামে এক ক্যান্টিন কর্মীকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং ক্যাম্পাসে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে পরদিন ২৩ জুলাই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে সব অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে ২৬ জুলাই প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেওয়া হলেও ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে ঘটনার পাঁচ দিন পার হলেও শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত দাবিগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সময়মতো সিলেবাস শেষ হওয়া নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ছুটির কারণে অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে চলে যাওয়ায় তাদের নিয়মিত পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পূর্বঘোষিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করা নিয়ে চরম বিপাকে পড়বেন শিক্ষার্থীরা।
এর আগে, ২৬ ব্যাচের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চলাকালে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাইগ্রেশন হয়। নবীন শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঈদের ছুটি ও প্রস্তুতিমূলক ছুটির (পিএল) মধ্যেও অতিরিক্ত দুই সপ্তাহ ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সিলেবাস শেষ করতে হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য হল প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্তের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল এবং হলের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া অপরাজিতা ও বিজয়-২৪ ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং ওই দুই হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া সাপেক্ষে পুনরায় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যদিকে, এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সাময়িক বহিষ্কৃত শিক্ষক অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কেন্দ্রের তদন্ত কমিটির দুটি তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন এবং আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আশ্বাস দেন।
ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আবু সোয়াইব হোসেন শাওন বলেন, দাবি বাস্তবায়নে বিলম্ব আমার ব্যক্তিগত পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নতুন টার্মের ক্লাস শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যার কারণে আমাদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম হঠাৎ করেই থমকে গেছে। এই পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে আমাদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। আমরা নির্ধারিত সময়ে টার্ম শেষ করতে পারব না। কম সময়ে সিলেবাস শেষ করতে গিয়ে অনেক বিষয় ভালোভাবে শেখাও সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, দাবি বাস্তবায়নে বিলম্ব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে। সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও টার্মের সময় অতিবাহিত হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে টার্ম শেষ করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবিগুলো মেনে নিয়েছে। কিন্তু দাবি জানানোর পরপরই প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। বরং রুবেল আনসারের বিরুদ্ধে, যিনি গত এক বছর ধরে বেতনসহ সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন, আবার নতুন করে অভিযোগ দাখিল করতে হবে— বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, চলমান তদন্ত, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো দ্রুত কার্যকর করার জন্য প্রশাসন কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এবং ছাত্রী হলের ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটার আরও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভেন্টিলেটারে অস্বচ্ছ (নন-ট্রান্সপারেন্ট) গ্লাস স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা হলে নিরাপদ ও স্বস্তিকর পরিবেশে বসবাস করুক।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি হলো— ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টের জবাবদিহি নিশ্চিত করা; যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত দুই শিক্ষক ড. রুবেল আনসার ও অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
আরটিভি/এমএইচজে