সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬ , ০৫:০৫ পিএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রতিষ্ঠার দুই দশক পর প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একজন শিক্ষক উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছেন। গত ১৪ মে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন তিনি।
উপাচার্য হিসেবে তার মিশন ও ভিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের পরিকল্পনা, নতুন ক্যাম্পাস, শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন এবং কুবির ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সামগ্রিক ভাবনা জানতে তার সঙ্গে একান্তে কথা বলেছে আরটিভি।
আরটিভি: আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?
উপাচার্য: ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।
আরটিভি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন? আপনার প্রধান ভিশন ও মিশন কী?
উপাচার্য: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমার মূল লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমাদের সবার প্রত্যাশা ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান স্টেকহোল্ডার শিক্ষার্থীরা। তাই তাদের জন্য একটি নিরাপদ, আনন্দময় ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে আমার প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার।
বর্তমান সময়ের চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য কারিকুলামকে যুগোপযোগী ও সৃজনশীলভাবে সাজানোর পাশাপাশি তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আমি সবসময় ‘স্টুডেন্ট ফার্স্ট’ নীতিতে বিশ্বাস করি। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতিটি বৈঠকেই আমি এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল প্রত্যাশা করা যায় না। তাই তাদের অগ্রগতির পথে যেসব সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেগুলো দূর করাই হবে আমার প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য।
আমার ভিশন একটাই, শিক্ষার্থীদেরকে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, মানবিক, শিক্ষাবান্ধব ও গবেষণামুখী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা।
আরটিভি: শিক্ষার্থীদের আবাসন, পরিবহন, ডাইনিং ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে আপনার প্রশাসনের কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আমি একটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছি, সেটি হলো ‘স্টুডেন্টস ফার্স্ট’। সেই ভাবনা থেকেই শিক্ষার্থীদের আবাসন, ডাইনিং, পরিবহন ও চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছি। যেসব উদ্যোগ স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলোকেই প্রথমে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডাইনিংয়ের মানোন্নয়নের জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি মূল্যায়ন টিম গঠন করা হবে। তারা সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে হলের ডাইনিংগুলোকে এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই ডাইনিংয়ের সেবার মান সম্পর্কে ধারণা পাবে এবং সেবার মানোন্নয়নেও ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।
পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের যানবাহনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত হলেও চালকের সংকট রয়েছে। এ সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।
চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ববর্তী প্রশাসনও কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। আমরা সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছি। ইতোমধ্যে একজন টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেডিক্যাল সেন্টারে একজন ফার্মাসিস্ট নিয়োগের বিষয়েও ফার্মেসি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে তা নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিবেন?
উপাচার্য: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে, তা সত্য। এর পেছনে কয়েকটা কারণ রয়েছে; তার মধ্যে নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়া, বিদেশে শিক্ষা ছুটিতে গিয়ে অনেক শিক্ষক ফিরে না আসা অন্যতম। শিক্ষাছুটিতে গিয়ে যারা ফিরে আসেনি তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। নতুন পদ সৃষ্টির জন্য ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) আবেদন করা হয়েছে। গত ২৩ তারিখ ইউজিসিতে এটা নিয়ে মিটিংও বসেছে। আশা করছি শীঘ্রই এ সমস্যার কিছুটা হলেও নিরসন হবে।
নিয়োগে স্বজনপ্রীতি থাকবে না। স্বজনপ্রীতি এবং দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা ও দৃঢ়তা রয়েছে। অস্পষ্টতা রেখে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া উচিত না। কোন কোন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়া হবে, তা প্রার্থীকে আগে থেকেই জানিয়ে দেওয়া হবে। আমরা নিয়োগ বিধি তৈরী করবো, সেই বিধির আলোকেই নিয়োগ হবে।
আরটিভি: শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, র্যাগিং এবং মাদক প্রতিরোধে আপনার প্রশাসনের পদক্ষেপ কী হবে?
উপাচার্য: র্যাগিং ও মাদক শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। এসব কমিয়ে আনতে হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি ইতিবাচক বিকল্প কার্যক্রমও বাড়াতে হবে। আমরা যদি নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের আয়োজন করতে পারি, তাহলে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে বেশি সম্পৃক্ত হবে এবং এ ধরনের সমস্যাও অনেকটাই কমে আসবে।
মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলার বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি। সুযোগ থাকলে প্রতিবছর ডোপ টেস্টের মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইতাম। তবে, এটি এককভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
নিরাপত্তার বিষয়ে বলতে গেলে, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হল প্রভোস্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী টিউশনের কারণে নিয়মিত ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান করেন, তাদের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে, যাতে প্রয়োজনে দ্রুত যোগাযোগ ও সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।
আরটিভি: কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন একটি ক্যাম্পাস নির্মাণাধীন রয়েছে, সেই ক্যাম্পাস উদ্বোধনের ব্যাপারে কী ভাবছেন?
উপাচার্য: নতুন ক্যাম্পাসকে একটি গ্রিন ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে আমি ইতোমধ্যে পরিবেশবিদদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করেছি। শিগগিরই তাদের নিয়ে আনুষ্ঠানিক সভা করে কাজ শুরু করা হবে।
নতুন ক্যাম্পাস চালুর বিষয়ে বলতে গেলে, সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) একনেকে অনুমোদন পেলে ১২ মাসের মধ্যে সেনাবাহিনী ক্যাম্পাস হস্তান্তর করতে পারবে বলে জানিয়েছে। আমি আশাবাদী, আগামী এক মাসের মধ্যেই আরডিপিপি একনেকে অনুমোদন পাবে। সে অনুযায়ী ২০২৭ সালের আগস্টে আমরা নতুন ক্যাম্পাসের পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো বুঝে পাব।
তবে, আমি পুরো ১২ মাস অপেক্ষা করতে চাই না। ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসের অনেক কাজ শেষ হয়েছে। তাই আরডিপিপি অনুমোদনের ছয় মাসের মধ্যেই আংশিক অবকাঠামো বুঝে নিয়ে কয়েকটি বিভাগ দিয়ে নতুন ক্যাম্পাসের কার্যক্রম শুরু ও উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। সে হিসেবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতেই নতুন ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মাত্র ১৯টি বিভাগ রয়েছে, নতুন বিভাগ চালুর কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
উপাচার্য : আমি নতুন পাঁচটি বিভাগ চালুর জন্য ইউজিসিতে আবেদন করেছি; অনুমোদন পেলেই চালু করতে পারব। যে পাঁচটি বিভাগ চালুর আবেদন করেছি তা হলো ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), মাইক্রোবায়োলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, পপুলেশন সায়েন্স এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট।
আরটিভি: ক্যাম্পাসে শিক্ষক রাজনীতি এবং কুকসু নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ। তাই শিক্ষকরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। তবে, তারা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হতে পারবেন না, এমনটি বলা যায় না। আমার মতে, শিক্ষকদের সংগঠন দলীয় নয়, পেশাজীবী সংগঠন হওয়া উচিত। নিজেদের পেশাগত অধিকার ও দাবি-দাওয়া আদায়ে শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং সমিতি গঠনের অধিকার রয়েছে। সেখানে বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
কুকসুর বিষয়ে বলতে গেলে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদের কোনো বিধান নেই। তবে, এ নিয়ে পূর্ববর্তী প্রশাসন কাজ করেছে এবং অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। আমি মনে করি, ছাত্র সংসদ গঠনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেভাবে কুকসু চায়, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই ছাত্র সংসদ গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশক হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সমাবর্তন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: আমার মতে, প্রতিবছরই সমাবর্তন আয়োজন করা উচিত। তবে, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। পূর্ববর্তী প্রশাসন দ্বিতীয় সমাবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আমার পরিকল্পনা হলো, নতুন ক্যাম্পাস চালু হওয়ার পর সেখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করা।
আরটিভি: ব্যস্ততার মাঝেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
উপাচার্য: আপনাকেও ধন্যবাদ।
আরটিভি/এসএইচএম