বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ , ১২:৩২ পিএম
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণানির্ভর ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন। সেশনজট নিরসন, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্তি, গবেষণা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন সংকট সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টির নানা পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নানা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আরটিভির ববি সংবাদদাতা ডালিয়া হালদারের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ।
আরটিভি: ২০৩০ সালের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?
উপাচার্য: আমি ২০৩০ সালের মধ্যে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি স্মার্ট, গবেষণানির্ভর, উদ্ভাবনী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের মূল ভিশন হলো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, গবেষণামুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
আরটিভি: সেশনজট নিরসনে কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে?
উপাচার্য: আমরা নিয়মিত ক্লাস, সময়মতো পরীক্ষা এবং দ্রুত ফল প্রকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। নির্ধারিত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। সেশনজট অনেকটাই কমেছে। আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছি এবং খুব শিগগিরই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা করতে পারব বলে আশা করছি।
আরটিভি: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট নিরসনে আপনার করণীয় কী?
উপাচার্য: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের একটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছি। ইউজিসি আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, খুব শিগগিরই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। আমাদের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থী-শিক্ষকের গ্রহণযোগ্য অনুপাত নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। এতে শিক্ষার মানোন্নয়ন, পাঠদান কার্যক্রমের গতি বৃদ্ধি এবং বিভাগগুলোর ওপর বিদ্যমান চাপ অনেকটাই কমবে বলে আমরা আশা করছি। দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠে একটি কার্যকর ও মানসম্মত অ্যাকাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
আরটিভি: আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক র্যাংকিং উন্নয়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক সভা করেছে এবং আন্তর্জাতিক র্যাংকিং কর্তৃপক্ষের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর কাজ চলছে। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান দেখতে পাব।
আরটিভি: গবেষণার উন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
উপাচার্য: গবেষণার মানোন্নয়ন আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্যও গবেষণা অনুদান চালু করেছি। ভবিষ্যতেও এটি অব্যাহত থাকবে। গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, গবেষণা প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উচ্চমানের জার্নালে প্রকাশে উৎসাহ এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে আমরা গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিতে চাই। এতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও কর্মজীবনে আরও দক্ষ হয়ে উঠবে এবং দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে।
আরটিভি: অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: নতুন অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহায়তা কর্মসূচির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সরকারের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও আমরা প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী পাঁচ বছরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে।
আরটিভি: আবাসন সংকট সমাধানে কী অগ্রগতি হয়েছে?
উপাচার্য: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। এটি সমাধানের জন্য আমরা একটি মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছি। আশা করছি, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এ সংকট অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হবে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হবে। এরপর নতুন কতটি আবাসিক হল নির্মাণ করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। তবে আবাসন সংকট নিরসনে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি।
আরটিভি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
উপাচার্য: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও তরুণ প্রজন্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা স্মরণীয়। সেই ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলেই নির্মাণকাজ শুরু হবে। আমরা চাই এটি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে উঠুক।
আরটিভি: মেধাবী শিক্ষার্থী ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: মেধার স্বীকৃতি উৎকর্ষ অর্জনে অনুপ্রাণিত করে। এ কারণেই আমরা মেধাবৃত্তি ও ডিনস মেরিট অ্যাওয়ার্ড চালু করেছি। ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কী?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের নীতিতে বিশ্বাসী। বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করা হয়েছে। দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আমরা সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছি।
আরটিভি: শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অ্যালামনাইদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কী?
উপাচার্য: বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি এটি একটি বড় দায়িত্বও। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অ্যালামনাইদের প্রত্যাশা পূরণ করে একটি আধুনিক, গবেষণাভিত্তিক ও মানবিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের সবার প্রতিষ্ঠান। এর উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির দায়িত্বও আমাদের সবার। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, জ্ঞানচর্চা ও ইতিবাচক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি।
আরটিভি/এমএইচজে